নবকণ্ঠ ডেস্কঃ জুলাই ঘোষনাপত্র ও গৃহীত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মন্তব্য করেছে জুলাই অভ্যুত্থানের অকুতোভয় ইউনিট প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ। তাদের ফেসবুক পেজে এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার শুরু থেকেই ব্যর্থতার পথে ছিল, কারণ সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রত্যাশা ও আন্দোলনের প্রকৃত চেতনা প্রতিফলিত হয়নি।
তাদের দাবি, এই সরকার ক্ষমতায় এলেও সফল হওয়ার বাস্তব কোনো কারণ ছিল না। যাদের রক্ত, ত্যাগ ও প্রাণ বিসর্জনের বিনিময়ে অভ্যুত্থানের পথ তৈরি হয়েছিল, তাদের স্বপ্ন ও চাহিদা পূরণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং, ড. ইউনুস অভ্যুত্থানের ঘটনাকে দেখেছিলেন অল্প কয়েকজন ছাত্র উপদেষ্টা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে, যার মধ্যে জনাব আসিফ নজরুলের মতো কিছু নাম বিশেষভাবে আলোচিত ছিল।
অ্যালায়েন্সের মতে, তিনি অভ্যুত্থানের চেতনা গভীরভাবে ধারণ করা নেতাদের দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন না করে, নিজের এনজিও কোটা, ব্যক্তিগত পছন্দের লোক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক কোটার প্রতিনিধিদের প্রাধান্য দিয়েছেন। এর ফলে সরকারে অভ্যুত্থানের মুল স্পিরিট প্রতিফলিত হয়নি, বরং নানামুখী স্বার্থসংঘাত তৈরি হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের কর্মক্ষমতা হ্রাস করেছে এবং ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি একাধিক ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ তৈরি করেছেন, যা তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় এই সরকার ছিল একটি ‘টেকনোক্র্যাটিক’ বা বিশেষজ্ঞ-নির্ভর প্রশাসন। তাত্ত্বিকভাবে এই ধরনের সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের মানুষের মতামত নেওয়া হয়নি, বরং একপাক্ষিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করায় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে চলে গেছে।
PUSAB অভিযোগ করে, অভ্যুত্থানের পর ড. ইউনুস রাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। প্রথমে তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতা ও ছাত্র উপদেষ্টাদের ওপর আস্থা রাখেন। কিন্তু তাদের লাগামহীন কর্মকাণ্ড, ভুল সিদ্ধান্ত ও বিতর্কিত আচরণে জনসমর্থন কমে গেলে তিনি বিএনপি ও অন্যান্য দলের নেতাদের ওপর নির্ভর করা শুরু করেন। অথচ এই অভ্যুত্থানের মুল শক্তি ছিল সাধারণ জনগণ—যাদের দাবিদাওয়া শোনা হয়নি, পূরণ তো দূরের কথা। ফলে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র তার কাছে স্পষ্ট ছিল না। তিনি একটি সাজানো বর্ণনার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, যা পরিস্থিতির সঠিক প্রতিফলন দেয়নি।
সংগঠনটি আরও অভিযোগ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সরকারের মধ্যে একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চেয়েছে। তাদের এই মনোভাবের কারণে অন্য কোনো পক্ষ সরকারে প্রবেশ করতে পারেনি। প্রথমে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মকে একপাক্ষিক করে ভেঙে দেওয়া হয়, এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকেও দুর্বল করে ফেলা হয়। আন্দোলনকারীরা বিভ্রান্তিতে পড়ে, কারণ রাজনৈতিক আলোচনাগুলো সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তাত্ত্বিক বিতর্কে, মাঠ পর্যায়ের বাস্তব সমস্যা থেকে দূরে সরে যায়। এর ফলে অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আন্দোলনের শক্তি ভেঙে পড়ে।
তাদের মতে, সরকারে থাকা ছাত্র উপদেষ্টা ও তাদের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো কোরামভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে গিয়ে নিজেদের ক্ষমতা হারিয়েছে এবং একই সঙ্গে সহযোগী গোষ্ঠীগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে ছাত্র প্রতিনিধিদের বিভিন্ন কমিটি, উপকমিটি ও কমিশনে বসানো হয়েছে। আহত ও শহীদদের চিকিৎসা, সহায়তা ও পুনর্বাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অদক্ষ ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যারা নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে ব্যস্ত থেকেছেন। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো অবহেলিত থেকেছে এবং প্রত্যাশিত ফল আসেনি।
সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নীতিগত সমন্বয়ের অভাব ছিল উল্লেখ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেয়া এ সংগঠন বলে, মন্ত্রণালয়গুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গড়িমসি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অহমিকা এবং নেতৃত্ব সংকটের কারণে নীতি বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটেছে। স্পষ্ট কোনো অর্থনৈতিক রোডম্যাপ না থাকায় ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, বিনিয়োগ হ্রাস এবং প্রশাসনিক অনিয়ন্ত্রণ জনমনে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফলে দেশীয় বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে নেওয়া নীতিগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।
বিচার ব্যবস্থার অবস্থাকেও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছে সংগঠনটি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে, পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয়, এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও বিচার অগ্রগতি নেই। অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণহত্যার বিচার শুরু হবে কবে—তা অজানা, অন্য হত্যাকাণ্ডেরও সঠিক তদন্ত ও বিচার হচ্ছে না। বরং অনেক সন্ত্রাসী ছাড়া পাচ্ছে, যা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
সবশেষে তারা সতর্ক করে বলেছে, পুলিশ ও প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়াই সরকার এখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনের পথে হাঁটছে, যা তাদের জন্য নিরাপদ প্রস্থান কৌশল হতে পারে, কিন্তু দেশের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে।
সঠিকভাবে নির্বাচন আয়োজন ব্যর্থ হলে নতুন রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে, পরিস্থিতি অরাজকতার দিকে যাবে, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। অ্যালায়েন্সের প্রশ্ন—এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কি কোনো কার্যকর সমাধান ভেবে রেখেছেন ড. ইউনুস?
নিউজের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

