ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ কী?

ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ কী?

নবকণ্ঠ ডেস্কঃ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘নিরাপদ দেশ’-এর নতুন তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের মাঝে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইইউ কমিশন সম্প্রতি বাংলাদেশসহ সাতটি দেশকে এই তালিকায় যুক্ত করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুততর ও দক্ষ করা। এই তালিকা ইইউর নতুন ‘প্যাক্ট অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম’ আইনের অংশ, যা ২০২৬ সালের জুলাই থেকে পুরোপুরি কার্যকর হবে। এই ঘোষণার পর ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের আশ্রয় প্রক্রিয়া আরও কঠোর ও দ্রুত হয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কিত আশ্রয়প্রার্থীরা।

তবে ফ্রান্সের আইনি ব্যবস্থায় এই ইইউ তালিকা সরাসরি বাধ্যতামূলক নয় বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ও শীর্ষস্থানীয় এনজিও ‘ফ্রঁস ত্যের্ক দাজিল’-এর প্যারিস-১৮ শাখার প্রধান রোমাঁ ফ্লাবিয়াঁ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন, ফ্রান্সে আশ্রয় সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় স্বাধীন সংস্থা অফপ্রা (ফ্রান্সের শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি সুরক্ষা দপ্তর)। ফরাসি আইন (কোড L.121-13) অনুযায়ী, কোন দেশ ‘নিরাপদ’ কিনা তা অফপ্রার পরিচালনা পর্ষদ নিজেই নির্ধারণ করে। বর্তমানে অফপ্রার নিজস্ব ‘নিরাপদ দেশ’ তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই।

ফ্লাবিয়াঁ ‘নিরাপদ দেশ’-এর মানদণ্ড ব্যাখ্যা করেন: যেখানে রাজনৈতিক নিপীড়নের ঝুঁকি নেই, আইনত সুরক্ষা কার্যকর, নির্যাতন বা নিষ্ঠুর আচরণ অনুপস্থিত, নারী-পুরুষ ও এলজিবিটিকিউআইএ+ ব্যক্তিরা সুরক্ষিত এবং সশস্ত্র সংঘাতের হুমকি নেই। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত (কঁসেই দ্যু এতা) ২০১৩ সালে বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ’ তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব নাকচ করেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছিল রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার মতো উদ্বেগজনক ইস্যু। ফ্লাবিয়াঁর মতে, “এই পর্যবেক্ষণ আজও পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি।”

যদি ভবিষ্যতে ফ্রান্স বাংলাদেশকে নিজস্ব ‘নিরাপদ দেশ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য তা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বয়ে আনবে বলে সতর্ক করেন ফ্লাবিয়াঁ। এর মধ্যে রয়েছে: আশ্রয় আবেদন দ্রুততর ও সরলীকৃত পদ্ধতিতে (দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া) মূল্যায়ন; অফপ্রা কর্তৃক আবেদন মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা; আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে শরণার্থী আপিল আদালতে (সিএনডিএ) আপিল করা গেলেও তা ‘স্থগিতাদেশমূলক’ (সাসপেনসিভ) হবে না (অস্থগিত-অযোগ্য আশ্রয় প্রক্রিয়া), ফলে আপিল চলাকালীনই আবেদনকারীকে ফ্রান্স ত্যাগের নির্দেশ (ওকিউটিফ) পাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

তবে ফ্লাবিয়াঁ জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ‘নিরাপদ’ তালিকাভুক্ত হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে না। অফপ্রা প্রতিটি আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবে। কেউ প্রমাণ করতে সক্ষম হলে যে তিনি দেশে ফেরত গেলে ব্যক্তিগতভাবে নিপীড়নের শিকার হবেন, তার আশ্রয় পাওয়ার পথ খোলা থাকবে। এই জটিল আইনি পরিস্থিতি এবং ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর এখন তাকিয়ে রয়েছেন ফ্রান্সে বসবাসরত শত শত বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থী।

 

-191

 

নিউজের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.