ফ্রান্সে সন্দেহভাজন বর্ণবাদী হামলায় নিহত ১, আহত ৫

ফ্রান্সে সন্দেহভাজন বর্ণবাদী হামলায় নিহত ১, আহত ৫

নবকণ্ঠ ডেস্ক: ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপকণ্ঠে ইভলিন (Yvelines) বিভাগের ত্রাপ (Trappes) ও লা ভেরিয়ের (La Verrière) এলাকায় বন্দুকধারীর গুলিতে ২৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। হামলাটির পেছনে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে দেশটির তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে সংঘটিত এ ঘটনায় ইতোমধ্যে একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদ (Le Monde) ও টিএফ১ ইনফো (TF1 Info)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে এক ব্যক্তি গাড়ি থেকে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে একাধিক স্থানে গুলি চালান। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলা এ হামলায় বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। হামলার পর সন্দেহভাজন ব্যক্তি পার্শ্ববর্তী কোয়েনিয়ের (Coignières) এলাকায় চলে গেলে পুলিশ তাঁকে আটক করে। একাধিক স্থানে গুলি চালানোর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে নিহত ব্যক্তির নাম পেঙ্গো বসিও ওয়াঙ্গি (Pengo Bossio Wangi) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী ওয়াঙ্গি অপেশাদার মিক্সড মার্শাল আর্টসের (এমএমএ) অনুশীলন করতেন। তবে ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। হামলায় আহত পাঁচজনের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর অবস্থা গুরুতর বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্যারিসের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অন্য আহতদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এ ঘটনায় কেভিন টি. (Kévin T.) নামে ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এর আগেও বিভিন্ন সাধারণ অপরাধের ঘটনায় পুলিশের কাছে তাঁর পরিচিতি ছিল। অতীতে চুরি, মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত অপরাধ এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো অভিযোগে তাঁর নাম উঠে এসেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অতীতের এসব অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান হামলার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়।

সন্দেহভাজনের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে তদন্তকারীরা তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার এবং বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে সংযুক্ত একটি সন্দেহজনক ব্যবস্থা খুঁজে পেয়েছেন বলে জানিয়েছে ল্য মোঁদ। বিষয়টি নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করায় ঘটনাস্থলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ও বিশেষ পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করা হয়। উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামগুলো বিস্ফোরক তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, কিংবা সেগুলোর সঙ্গে গুলির ঘটনায় কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চালানো হচ্ছে।

হামলার সম্ভাব্য বর্ণবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌঁসুলির দপ্তর (PNAT) তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে। হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টার পাশাপাশি বর্ণবাদ কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা হামলার আগে ও পরে সন্দেহভাজনের আচরণ, তাঁর বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়গুলো পরীক্ষা করছেন।

ল্য মোঁদের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তি কৃষ্ণাঙ্গ ও আরবদের লক্ষ্য করার কথা বলেছিলেন বলে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এ ছাড়া তাঁর বাসা থেকে নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের লেখা ‘মাইন কাম্ফ’ (Mein Kampf) বই উদ্ধার করা হয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা হামলার পেছনে বর্ণবাদী বা চরমপন্থী মতাদর্শের প্রভাব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। তবে সন্দেহভাজনের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।

এ ছাড়া হামলার সঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তির একক সম্পৃক্ততা ছিল, নাকি তিনি অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক সরঞ্জাম, কথিত বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্যের অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে একে বর্ণবাদী সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ঘটনাটিকে গুরুতর সন্ত্রাসী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর আইনি ভিত্তি, সন্দেহভাজনের উদ্দেশ্য এবং ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তদন্তের ফলাফলের ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে। একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হওয়ার এ ঘটনায় ফ্রান্সে বর্ণবাদী সহিংসতা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

 

নিউজের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.