ফ্রান্সে বাংলাদেশি পরিবারের গৌরবগাঁথা, দাবায় সাফল্যের আলো ছড়াচ্ছে দুই কিশোর প্রতিভা

ফ্রান্সে বাংলাদেশি পরিবারের গৌরবগাঁথা, দাবায় সাফল্যের আলো ছড়াচ্ছে দুই কিশোর প্রতিভা

নবকণ্ঠ ডেস্ক: প্রবাসজীবনের নানা প্রতিকূলতা, ভাষাগত বাধা ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতার মধ্যেও অধ্যবসায়, ত্যাগ এবং সুশিক্ষার মাধ্যমে সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রবি মজুমদার ও রীনা মজুমদার দম্পতি। ফ্রান্সে বসবাসরত এই বাংলাদেশি পরিবার আজ প্রবাসী সমাজে অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সে বসবাস করলেও নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পৃক্ত রাখতে সচেষ্ট রয়েছেন এই দম্পতি। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং সন্তানের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে তাঁরা তাঁদের দুই পুত্রকে গড়ে তুলছেন যোগ্য ও প্রতিভাবান নাগরিক হিসেবে। সেই প্রচেষ্টার ইতিবাচক ফল এখন দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।

দাবা খেলায় অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে ২০২২ সাল থেকে নিয়মিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে তাঁদের দুই সন্তান। তারা উভয়েই ফ্রান্সের ইউএসএমএ এশেক দ্য সাঁ-তুয়াঁ ক্লাবের সদস্য এবং ইতোমধ্যে সাঁ-তুয়াঁ ও সাঁ-দেনি বিভাগের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছে। স্থানীয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে তারা পরবর্তীতে ফ্রান্সের বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতাতেও উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

২০২৪ সালে তারা ফ্রান্সের জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতা ‘শ্যাম্পিওনা দ্য ফ্রঁস’-এ অংশগ্রহণ করে। আজেন শহরে অনুষ্ঠিত এই মর্যাদাপূর্ণ আসরে তাদের সাফল্য ও সম্ভাবনা নিয়ে ফ্রান্সের সুপরিচিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ল্য পেতি ব্লু’ এবং ‘লা দেপেশ’-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যা একটি বাংলাদেশি পরিবারের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।

সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৫ সালেও তারা ভিশি ও আলবি শহরে অনুষ্ঠিত জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। বর্তমানে দুই কিশোরই ফেডারাসিওঁ ফ্রঁসেজ দেজ এশেক এবং আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা ফিদের নিবন্ধিত খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃত।

প্রবাসে জন্ম বা বেড়ে ওঠা হলেও তারা নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে ধারণ করছে। পরিবারটির বিশ্বাস, খেলাধুলা ও মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একদিন আন্তর্জাতিক দাবা অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন, তাঁদের সন্তানরা ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জন করে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে।

তবে এই সাফল্যের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটুখানি আক্ষেপও। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশগ্রহণ, একাধিক শিরোপা জয় এবং ফরাসি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটি কিংবা বাংলাদেশি গণমাধ্যমে তাদের অর্জন নিয়ে তেমন কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি বলে মনে করেন পরিবারের সদস্যরা।

পরিবারটির প্রত্যাশা, তাদের সন্তানদের এই অর্জনের খবর বাংলাদেশি সমাজের আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছাবে। কারণ এমন সাফল্যের গল্প শুধু একটি পরিবারের গর্ব নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক অনুপ্রেরণা এবং অভিভাবকদের জন্যও উৎসাহের উৎস হতে পারে।

এ কারণে ফ্রান্সে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, কমিউনিটি সংগঠক, টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কমিউনিটি প্ল্যাটফর্মের পরিচালকদের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা এই দুই প্রতিভাবান শিশুর সাফল্যের কাহিনি বৃহত্তর বাংলাদেশি সমাজের সামনে তুলে ধরেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় তথ্য ও পূর্বে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনগুলো আগ্রহীদের জন্য সরবরাহ করা হবে। তাদের বিশ্বাস, এসব অর্জন প্রচারিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনেক শিশু মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাবে।

প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি শিশুদের সাফল্যকে সম্মান জানানো এবং তাদের উৎসাহিত করা পুরো কমিউনিটির দায়িত্ব বলেও মনে করেন অনেকে। রবি মজুমদার, রীনা মজুমদার এবং তাঁদের দুই মেধাবী পুত্রের এই অনন্য যাত্রা তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, বরং প্রবাসে বাংলাদেশি পরিচয় ও সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।

 

 

 

নিউজের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.