আজ ৩৬শে জুলাই, "পালায় না" বলা স্বৈরাচারের পলায়ন দিবস

আজ ৩৬শে জুলাই, “পালায় না” বলা স্বৈরাচারের পলায়ন দিবস

ক্যালেন্ডারে ৩৬শে জুলাই বলে কোনো দিন নেই। তবুও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দিনটি একটি প্রতীক। এটি এমন এক স্মৃতির নাম, যা কোনো মাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জাতির আশা, ক্ষোভ, আত্মত্যাগ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। কোনো স্বৈরশাসনের পতন কেবল একজন শাসকের বিদায় নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সামনে নতুন এক পরীক্ষার সূচনা। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—স্বৈরাচারের অবসান যতটা কঠিন, তার পরের সময়কে সঠিকভাবে সামাল দেওয়া তার চেয়েও কঠিন।

স্বৈরাচার তৈরিই হয় ধ্বংস হবার জন্য। হাসিনা একটি অতীত অধ্যায় তবে একজন জীবন্ত হাসিনা বাংলাদেশের জন্য জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতই কতটা অনিরাপদ তা বুঝতে হলে তার শেষ দিনের কর্মকান্ড দেখলেই বোঝা যায়। যে মুহুর্তে এই আর্টিকেল লেখা হচ্ছে ঠিক সেই মুহুর্তে বিদেশী একজন ক্রীতদাসী ফোন করে বিদেশী সরকারকে তাদের বাহিনী পাঠাতে বলছেন বাংলাদেশ ধ্বংস করে দেয়ার জন্য! বহু মানুষ এই ব্যাপারটি শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন। কিন্তু না! এর শেষ তো দূরের কথা, এটা ছিল শুরুমাত্র। তার প্রমান একে একে ষড়যন্ত্র করে বাংলাদেশকে দশগুন গতিতে দূর্বল করা হচ্ছে,  যদিও এ প্রক্রিয়া ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই চালু ছিল এবং ৭১ এ তা ভারতের রাষ্ট্রীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়। ঐতিহাসিক নেতারা এ সত্যটি খুব ভাল করেই জানতেন। কিন্তু সেসব ইতিহাস মুছে দিয়ে আশির দশকে শুরু হওয়া বৈশাখী উৎসবের সাথে স্যাটানিজমের মিশ্রন ঘটিয়ে শোভাযাত্রা নামে হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য বলে গেলানো শুরু হয়।

ঐতিহাসিক নেতারা এ সত্যটি খুব ভাল করেই জানতেন
ঐতিহাসিক নেতারা এ সত্যটি খুব ভাল করেই জানতেন

নতুন প্রধানমন্ত্রী যেভাবেই ক্ষমতায় এসে থাকুন না কেন, এখন স্ট্যাবিলিটি রক্ষার জন্য যে কোনো সংঘাত এড়িয়ে চলাটাই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এটি অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলেও একই কথা প্রযোজ্য হবে কারণ, সংঘাত তৈরী ছাড়া লীগের প্রবেশের আর কোনো দরজা খোলা নেই। গুম-খুন সহ বিরোধীদের উপর শতাব্দীর নিকৃষ্টতম নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত হাসিনাকে ভার্চুয়ালি কিম্বা স্বশরীরে দেশের মিডিয়ায় বা জেলখানায় যেখানেই উপস্থিত করা হবে তা হবে বিএনপি সরকারের জন্য চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, কারণ সম্পূর্ন প্রশাসনে তাদের ও পার্শবর্তী শত্রু দেশের এজেন্টের উপস্থিতি অর্ধেকের বেশী বলে ধারণা করা হয়। যে কোনো সাবোট্যাজ ও অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার আগুনে ঘি ঢালার জন্য প্রস্তুত আছে স্বৈরাচারের পা-চাটা এলিট ক্লাস, যাদেরকে উঠতে বসতে স্যার ডাকতে হয় সেই আমলা ও সিনিয়র সামরিক অফিসাররা। সাথে আছে ওপারের পছন্দের মিডিয়া আউটলেট। এদেশের পরিস্থিতি খারাপ হবে এটা ৯০ ভাগ মানুষ কিছু না কিছু টের পাচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও কোলের মধ্যে পোষা স্বৈরাচারের তাঁবেদার রা যদি সেই সময়টাকে এগিয়ে আনে দ্রুত গতিতে যেভাবে তারা এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে বিএনপি ধুলিস্যাত হবার সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে যাবে বাংলাদেশও।

ইতিহাসে এমন কোনো শাসনব্যবস্থার উদাহরণ নেই, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন দমন করে টিকে থাকতে পেরেছে। ক্ষমতা যখন জবাবদিহিতার উর্ধ্বে ওঠে, তখন তার পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু একটি স্বৈরশাসনের পতন মানেই তার প্রভাব, সংস্কৃতি এবং মানসিকতার অবসান নয়। অনেক সময় ব্যক্তি বিদায় নেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া বিভক্তি, ভয়, অবিশ্বাস এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতি বহু বছর ধরে রাষ্ট্রকে তাড়া করে বেড়ায়।

ইতিহাসে এমন কোনো শাসনব্যবস্থার উদাহরণ নেই, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন দমন করে টিকে থাকতে পেরেছে
ইতিহাসে এমন কোনো শাসনব্যবস্থার উদাহরণ নেই, যা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন দমন করে টিকে থাকতে পেরেছে

এই বাস্তবতা থেকেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সংঘাতকে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা এবং রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা। আর এর একমাত্র উপায় হল, আইন প্রয়োগ ও শাস্তি কার্যকর। প্রতিটি ঘটনায় কেন আলাদা করে বলতে হবে “অমুকদের আইনের আওতায় আনা হবে”? এ প্রশ্নের উত্তর হল, আইনের প্রয়োগ এখনো সিলেক্টিভ। এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা কখনো একক কোনো দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর মূল্য দেয় পুরো জাতি। বিনিয়োগ কমে, কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়, প্রশাসনিক কার্যকারিতা দুর্বল হয় এবং সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল হবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যা নতুন করে উত্তেজনা, প্রতিহিংসা বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগের স্থান আছে, কিন্তু রাষ্ট্র রক্ষা হয় বিচক্ষণতা দিয়ে। একটি দায়িত্বশীল নেতৃত্বকে সবসময় এমন পথ বেছে নিতে হয়, যা ক্ষণিকের রাজনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

বাংলাদেশের মানুষ গত কয়েক দশকে সংঘাতের রাজনীতির মূল্য অনেক দিয়েছে। রাজনীতিকে ঘৃণা করতে করতে স্বৈরাচারের গদির আরাম বাড়িয়ে দিয়েছিল গুম, খুন, রাজনৈতিক সহিংসতা, ভয়, দমন-পীড়নকে সহ্য করার মাধ্যমে। মতপ্রকাশের সংকুচিত পরিবেশ—এসব অভিযোগ ও অভিজ্ঞতা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা এখন প্রতিশোধ নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র, যেখানে বিচার হবে আদালতে, প্রতিহিংসার মঞ্চে নয়; যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার অংশ। বিপ্লবীদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও পথে-ঘাটে শত্রুতা কাউকে নিরাপদ করবে না। তা শুধুমাত্র ক্ষমতার ভিত্তিকে দুর্বল করবে। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকারের প্রায় সর্বস্তরে জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

ক্ষমতাসীন সরকারের প্রায় সর্বস্তরে জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
ক্ষমতাসীন সরকারের প্রায় সর্বস্তরে জুলাই বিপ্লবীদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং ভিন্নমতকে আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করার সক্ষমতায়। যে রাষ্ট্র প্রতিটি সংকটের উত্তর হিসেবে সংঘাতকে বেছে নেয়, সে রাষ্ট্র একসময় নিজের শক্তিও ক্ষয় করে ফেলে। আর যে রাষ্ট্র আইন, প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহিতাকে শক্তিশালী করে, তার গণতন্ত্র ধীরে ধীরে স্থায়িত্ব লাভ করে।

আজকের বাস্তবতায় প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য কাঠামোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে কেবল স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সংস্কার এবং নিরপেক্ষ আচরণের মাধ্যমে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্র বানানো হলে সেই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে পুরো রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।

ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা—উভয় পক্ষেরই একটি মৌলিক দায়িত্ব রয়েছে। সেটি হলো এমন রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র অচল হবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সহিংসতা হবে না; সমালোচনা থাকবে, কিন্তু প্রতিশোধের সংস্কৃতি ফিরে আসবে না।

স্বৈরাচারের পতনকে যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগে রূপান্তর করা না যায়, তবে সেই শূন্যস্থান আবারও নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদ পূরণ করার চেষ্টা করবে
স্বৈরাচারের পতনকে যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগে রূপান্তর করা না যায়, তবে সেই শূন্যস্থান আবারও নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদ পূরণ করার চেষ্টা করবে

বাংলাদেশের সামনে আজ সুযোগও আছে, ঝুঁকিও আছে। সুযোগ—একটি আরও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার। ঝুঁকি—অতীতের ভুলকে নতুন রূপে পুনরাবৃত্তি করার। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, স্বৈরাচারের পতনকে যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগে রূপান্তর করা না যায়, তবে সেই শূন্যস্থান আবারও নতুন কোনো কর্তৃত্ববাদ পূরণ করার চেষ্টা করবে।

৩৬শে জুলাই তাই কেবল একটি প্রতীকী দিন নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়, জনগণের শক্তি কোনো শাসককে বিদায় দিতে পারে, কিন্তু একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্থিতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ অনেক দীর্ঘ। সেই কাজ কখনো এক দিনে বা এক বছরে শেষ হয় না। এটা কোনো এক নির্বাচনে, কিংবা কোনো এক নেতার উত্থান বা পতনেও হয় না। এটি একটি চলমান জাতীয় দায়িত্ব।

আজ যারা রাজনীতি করেন, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং যারা আগামী দিনের নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখেন—সবার জন্য এই দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই: ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র স্থায়ী। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে; বিভাজন নয়, জাতীয় ঐক্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলেই ৩৬শে জুলাই কেবল একটি স্মৃতির দিন হয়ে থাকবে না, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের একটি স্থায়ী অঙ্গীকার হয়ে উঠবে।

-সম্পাদকীয়

 

 

সাইটের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.