শবে বরাত: “শব”টা অর্জনের; নাকি সবটাই বর্জনের!

shab-e-Barat

[author image=”https://fbcdn-sphotos-b-a.akamaihd.net/hphotos-ak-xfp1/v/t1.0-9/11075167_10202648661897216_5284593407040578317_n.jpg?oh=26dea1088ed383b2a9c3e46b78b72fd0&oe=55F90472&__gda__=1442444567_587b0d06ab1421fd1608dd2d2c6e0fa7″ ]ফাহিম বদরুল হাসান[/author]

■■”শবে কদর শবে বরাত
বছরের সেরা এ দুই রাত”।
এটা ছিল আমাদের সময়ের মাদরাসার প্রথমশ্রেণীর বাংলা বইয়ের পঙ্‌ক্তি (এখন হয়তো নেই)।
শবে বরাতকে শবে কদরের সাথে মিলিয়ে ফেলা, এটা যেমন ভাবনার বিষয়। তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্নের বিষয় হচ্ছে, এই শবেবরাত নিয়ে ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে প্রচলিত বিদ’আহ সমূহ।
বছরের আর কোনো দিনকে উপলক্ষ করে এতো নন-ইসলামিক কাজ হয় না। এখন অবশ্য শবে মি’রাজ উপলক্ষেও বহুত নব-চিজ দেখা যাচ্ছে।
শুধু ভারতবর্ষ বললে ভুল হবে, পৃথিবীজুড়েই বিদ’আতের ছড়াছড়ি। একেক এরিয়ায় একেক রকম।

●●ধরুন, আমাদের এলাকা। বাংলাদেশের মধ্যে আলেম এবং ধর্মপরায়ণতার দিক থেকে প্রথম সারিতে যদি সিলেটকে রাখা হয়, কানাইঘাট সিলেটের মধ্যে অন্যতম। এই অঞ্চলে যেমন রয়েছেন হাজার হাজার আলেম, তেমন আছে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখার মত ধর্মীয় মূল্যবোধ। আপনি পথ দিয়ে যাচ্ছেন, বিপরীত দিক থেকে আসা নারী পথের পাশে দাঁড়িয়ে আপনাকে সাইড দেবে, যদিও নারী নেকাব পরা। বসে তাস খেলছে। দেখবেন, মাথায় একটা টুপি! আমার এক বন্ধু তো কৌতুক করে বলতো- “মাথায় টুপি মুখে দাড়ি হাতে বিড়ি;
বাড়ি কই? কানাইঘাট”।
কিন্তু এতো আলোকিত একটা অঞ্চলেও বিদ’আতের আধিপত্য দেখলে অবাক হতে হয়!

●● শা’বান মাসের শুরু থেকে ঘরে ঘরে শিরনি বিতরণের রেওয়াজ। ধনী-গরীব সবাই এটা করে। মনে হয়, ফরয করা হয়েছে। বরাতের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, নির্দিষ্ট সুরা/দোয়ার মাধ্যমে বরাতের নামায পড়া। সম্মিলিত হয়ে মসজিদে ওয়াজ, মিলাদ ইত্যাদি করা। 381161-14e
সবচে’ আশ্চর্য্যের বিষয় ছিল, শবে বরাতের মিছিল। আমরা সেই রাতে আগরবাতি জ্বালিয়ে মশাল মিছিলের মত মিছিল দিতাম-
“আমার বরাত তোমার বরাত,
শুবে বরাত শুবে বরাত।
আমার দিন তোমার দিন,
নেকি’র দিন নেকি’র দিন।”
এগুলো ছিল অনেক বাড়াবাড়ি। উলামা-এ-কেরাম যে কেন তখন বাঁধা দেন নি, এখনো উত্তর পাইনি!

■■ এখন সমস্যাটা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। একদিকে বিদ’আতীরা ঝিনুকে কাদা মাখিয়ে মূল্যহীন করে তুলছে, অন্যদিকে কিছু লোক ঝিনুকে মুক্তার অস্তিত্বই স্বীকার করতে নারাজ!
তাদের মতে শবেবরাত একটি ফাও, ভাওতাবাজি এবং ইসলাম বহির্ভূত কাজ। এই রাতের ফযিলত বা মহিমায় কোনো দলিল কোর’আন-হাদিসে নেই।
বিরোধিতা আবার দুটি কারণে করা হচ্ছে। এক; শুধুই বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা। দুই; না জানার কারণে। দ্বিতীয় কারণে যাঁরা “শবেবরাত” বলতে কিছুই পান না তাঁদের জন্য হাদিস থেকে কিছু দলিল বর্ণনা করা হল।

১ম হাদীসঃ
মুআয ইবনে জাবাল বলেন, নবী করীম (স.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ- শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের)
দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (হাদীসটির সনদ সহিহ) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান তার কিতাবু সহীহ এ (যা
সহীহ ইবনে হিব্বান নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ, ১৩/৪৮১ এ) এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। এটি এই কিতাবের ৫৬৬৫ নং হাদীস।

এ ছাড়া ইমাম বাইহাকী (রহঃ) শুআবুল ঈমান এ (৩/৩৮২, হাদীস ৩৮৩৩); ইমাম তাবরানী আলমুজামুল কাবীর ও আলমুজামুল আওসাত এ বর্ণনা করেছেন।

২য় হাদিসঃ
হযরত আলা ইবনুল হারিস (রহঃ) থেকে বর্ণিত, হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (স.) রাতে নামাযে দাঁড়ান lake prayerdএবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হল তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তার বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশাঞ্চ অথবা বলেছেন, ও হুমাইরা, তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার এই আশংকা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। নবীজী জিঞ্চেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ (স.) তখন ইরশাদ করলেন, ‘এটা হল অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তার বান্দার প্রতি মনযোগ দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।‘ (শুআবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২-৩৬৮)

ইমাম বাইহাকী (রহঃ) এই হাদীসটি বর্ণনার পর এর সনদের ব্যাপারে বলেছেন, هذا مرسل جيد(সাবধান! “মুরসাল” কিন্তু যয়ীফ না)

৩য় হাদিসঃ
সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছেঃ হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, জ্ঞাপনের শাবানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোযা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোন ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোন রিযিক প্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দেব। এভাবে সুব্‌হে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাঞ্চআলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদের ডাকতে থাকেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৮৪)

এই বর্ণনাটির সনদ যয়ীফ। কিন্তু মহাদ্দিসীন কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে যয়ীফ হাদীস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোযা রাখার কথা সহীহ হাদীসে এসেছে এবং আইয়ামে বীয অর্থাৎ প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা রাখার বিষয়টিও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

○আসুন। বিদ’আত ছাড়ি, সুন্নাহ ধরি। টিউমার কাটতে মাথা কাটবেন না।

(উপরে উল্লেখিত হাদিসসমূহ সহ আরো বহু হাদিস আরবি মতন কমেন্টে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.