
[author ]সোহাইল আহমদ সুহেল (ফ্রান্স)[/author]
রানা প্লাজায় ফাটল ধরেছে , যে কোনো সময় ধ্বসে পড়বে রানা প্লাজা, ভেঙ্গে পড়বে পুরো ভবন, মৃত্যুপুরীতে ধাবিত হবে অজস্র প্রাণ, এমন বস্তুনিষ্ঠ বিপর্যয়ের আগাম সংবাদ ও সচিত্র প্রতিবেদন দেশ বিদেশের নানা মাধ্যমে আমরা শুনতে পাই ২৩ শে এপ্রিল। খবরটি ভয়ংকর হলেও কোন গুজব ছিল না ঠিকই। পরের দিন ২৪ শে এপ্রিল ২০১৩ ইংরেজি সকাল ৮ টা ৪৭ মিনিটে মহা প্রলয়ের ন্যায় সমগ্র রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ে। রানা প্লাজার মালিক যুব লীগ নেতা রানার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ ও দাম্ভিকতায় পৃথিবী হতে চিরতরে হারিয়ে যায় বহু বনি আদম। মানুষ দেখে এক হৃদয় বিদারক ট্র্যাজেডি। মুহূর্তে সাভারের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে।
পাকা দেয়ালে ক্ষতবিক্ষত মানুষের কান্না আর স্বজনদের আহাজারিতে সব একাকার হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে লাশের মিছিল আর স্বজন হারানোর মাতম বাড়তে থাকলো। ডিজিটাল সরকারের এনালগ উদ্ধার যন্ত্র সেদিন কোন কাজে আসে নি আহা কি বিপর্যয় ভাবতে কষ্ট হয়, কান্না আসে। রানা প্লাজা ধ্বসে রানার কিছু না হলেও অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের। সে অতীত কাল হতে মসলিনের কদরে বাংলাদেশের পথে আজো বিশ্বের নামী দামী ব্র্যান্ড এর আনাগোনা অব্যাহত আছে। বিশ্ববিখ্যাত টেক্সটাইল বুটিক, C&A, ZEEMAN , NEW MAN , ঊশাণ, মার্কস এন্ড স্পেন্সার, ও কার্ফুর হরদম বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানী করে বিশ্ব বাজারে বিক্রি করে আসছে।

বাংলার বস্ত্রশিল্পের দীর্ঘ দিনের সহযাত্রী এই কোম্পানি গুলো বর্তমানে সাভার ট্র্যাজেডির ফলে ক্ষিপ্ত ও হতভম্ব হয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ব্যবসা স্থানান্তরের আগ্রহী হয়ে ওঠছে। দেশ ছাড়া ও বিদেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন , মানবাধিকার সংগঠন, ও গ্রাহকরা পর্যন্ত প্রতিবাদ ও নিন্দা করছেন। বহির্বিশ্বে প্রতিবাদ আর নিন্দার ভাষা পণ্য বর্জনের মাধ্যমে পালন হচ্ছে। বৃটিশ আমেরিকা ছাড়া ইউরোপের বাজার হাত ছাড়া হচ্ছে। দেশের জাতীয় আয়ের প্রধান মাধ্যম টেক্সটাইল খাত তার বর্ণিল ঐতিহ্য আজ বিলীন করে ধ্বংস হবে তা দেশের বিবেকবান মানুষ মেনে নিবে না। এ ব্যাপারে কর্তা ব্যক্তিদেরও ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
রানা প্লাজার ঘটনা কোন দুর্ঘটনা যে নয় তা প্রবাসে বসে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। যখনই কোন বিদেশির সাথে নিজের দেশ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি তখনই নিন্দা ও ক্ষোভের মাধ্যমে সাভার ট্রাজেডির কথা বলছে। এইতো সেদিন ২৫ শে মার্চ ফ্রান্সের অনতিদূরের শহর মাখছাই এর এক অভিজাত রেস্টুরেন্টে বন্ধুবর শামিমকে নিয়ে দুপুরের খাবার গ্রহণের সময়ে এক ব্যক্তি আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় জানতেই দুঃখ ভারাকণ্ঠে শ্রমিকদের মৃত্যু্র কথা স্মরণ করলেন আর সে সময় রেস্টুরেন্টের ওয়েটার সহ অনেকেই নামি দামি কয়েকটি ব্যান্ডের পোশাক বর্জনের সিদ্ধান্ত জানাল। তাদের এই প্রতিবাদের ধরনের ঘৃ্নার বহিঃপ্রকাশ দেখে আমরা সত্যিকার অর্থে হতবাক ও ভরাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে রেস্টুরেন্ট সিভাস্তিন থেকে প্রস্থান করি।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও আমেরিকা বর্তমানে নানা কৌশলে তাদের কোম্পানি গুলোর জন্য আইন কঠোর করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমেরিকার একটি ব্র্যান্ড তাদের বাংলাদেশী তরুণীর উলঙ্গ ছবি ব্যাবহার করে প্রতিবাদের জানান দিয়েছে। Lamain D`oeuvre Sacrifie`E De Textile, CCFD , LMEF আজ বাংলাদেশের বিষয়ে ভিন্ন প্রক্রিয়া গ্রহণ করেছে। ফ্রান্সের এস্তাম্বলী ন্যাশনালে সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল 5A তে `le monde deen face নামক প্রোগ্রামে বিশ্লেষণ ধর্মী আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণে রানা প্লাজার মালিক রানার দাম্ভিকতা, শ্রমিক হয়রানি, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী অমূল্যায়ন, লগো কারসাজি, সংবাদ কর্মীদের অসহযোগিতা ও সর্বোপরি অব্যবস্থাপনাড় চিত্রফুটে ওঠে।
ফুঠে ওঠে অবহেলা, হতাশা, আর নিরাশার মাঝে টেক্সটাইল শ্রমিকদের জীবন যাপনের বাস্তব চিত্র। ফ্রান্সের আলোচিত ব্যাঙ্গ পত্রিকা শারলি এবদো তার প্রচ্ছদে রোগা বক্ষে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ডামি ছবি ছাপিয়েছে। যা সভ্যতা ও মানবাধিকারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার এক প্রতিচ্ছবি।
সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর জীবিত উদ্ধার হয়েছে পাঁচশো জনের মতো শ্রমিক। হাত পা হারিয়ে অল্পের জন্য বেঁচে থাকেন অনেকেই। পপি, লাইলি, সাথী, আর লুৎফুর জীবন সংগ্রামে মৃত্যুর মুখোমুখি এ করুণ বাস্তবতাকে সঙ্গী করে বাঁচবে অনাদিকাল। রেশমা নাটক আর রানার শুটিং দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা মানুষ মেনে নেবে না কোনোদিন।
