[author image=”https://scontent-sin6-1.xx.fbcdn.net/v/t1.0-1/c0.0.734.734/13882663_10209838761709430_2660497264205838333_n.jpg?oh=1c07e7faf32d1691c1af9e3438b81505&oe=58A82565″ ]ইলোরা জামান[/author]
ইলোরা জামানঃ
শাহবাগের চিকন চিকন মোমবাতির আগুণে পুরো দেশ দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দেবার প্রায় অর্ধযুগ আগের কথা। জাতীয়তাবাদ কি জিনিস তা জানতাম না। আওয়ামীলীগ ঘৃণা করবার মত বয়সও ছিলোনা। জামায়াত-শিবির বুঝতামনা। তখনো শুধু একজন মানুষ ছিলাম। যে মানুষেরা কষ্ট পেলে কাঁদে, সামান্য একটু সুঁই এর খোঁচা লাগলে ব্যথা পায়, আর বিভৎস দৃশ্য দেখে আল্লাহ! আল্লাহ গো বলে কাঁপতে থাকে। সেরকম এক কিশোরী ছিলাম।। এখন যদিও শুধুই ফেইসবুকিয়ান হয়ে গিয়েছি মনুষ্যত্ব আর অনুভুতি পায়ে মাড়িয়ে।
টিভি অন রেখে লালরঙ শাড়ির পাড় লাগাচ্ছিলাম। স্ক্রীনে ভেসে উঠলো একটি সাপকে কতগুলো দোপেয়ে জন্তু লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে থেঁতলে থেঁতলে মারছে। ওর ওপরে উঠে যখন লাফানো শুরু করলো, তখন বুঝতে পারলাম, সে মানুষ ছিলো। আমাদের মতই। হাতে আমার সুঁই এর খোঁচা লাগলো। আমি যন্ত্রনায় উফ করে উঠতে ভুলে গেলাম। এতই ভয়ংকর ছিলো সেই দৃশ্য!

গোলাম কিবরিয়া শিপন ছিলো ছেলেটির নাম। একজন কুরআনে হাফেজ। মনে আছে আমার। অনেকেই হয়ত ভুলে গিয়েছেন। সে যে দলের অনুসারী ছিলো, তাঁর এক কট্টর সমর্থককে জিজ্ঞেস করেছিলাম আজ কথা প্রসঙ্গে। জবাব এসেছিলো, নামটা ভুলে গিয়েছি। আমি হেসেছি। ভুলে যাবারই কথা। আজ আমরা কেবল কে কার চাইতে ওপরে, কোন দল সঠিক, কে সঠিক নয় এসব নিয়ে মেতে।
২০০৬ সাল। সমাবেশের লাইভ সম্প্রচার চলছিলো। ছেলেটির মা টিভিতে দেখছিলেন সেই সমাবেশ। তাঁর ছেলেও যে গিয়েছে ওখানে। ক্যামেরা আচমকা সমাবেশের একটি জটলার দিকে ঘুরে যায়। একি দেখছেন তিনি! চারপাশ থেকে লগি আর বৈঠার আঘাত পড়ছিলো পাঞ্জাবী পরা ছেলেটির ওপর। প্রচন্ড আঘাতের পর আঘাত মানুষের শরীর নিতে পারেনা।
এজন্য একপর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর যত্ন করে সৃষ্টি করা বান্দাকে তুলে নেন সকল বোধ চেতনা আর অনুভুতির উপরে। অবচেতন মূর্ছা যাওয়া ছেলেটি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কেমন যেনো ঘোর লাগা মানুষের মত এদিক ওদিক উঠছে আবার পড়ে যাচ্ছে। আবার উঠছে পড়ছে। তাঁর কোনও অনুভুতি নেই এখন আর। সে পৃথিবী আর পরপারের মাঝামাঝি অবস্থায় এ মুহূর্তে।
এর কিছু পরেই এলো সে কাংখিত মৃত্যু। আর নড়াচড়া নেই। নিথর। তারপরও থামলোনা মৃত শরীরটিকে বাঁশ দিয়ে খোঁচানো।
বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে গেল একবিংশ শতাব্দির মধ্যযুগীয় বর্বরতায়। লাশের বুকের ওপর উঠে লাফানো। আনেক আগে মরা মানুষের কলিজা খাওয়া মানুষদের কথা মনে পড়ে যায় আমার। বাপ্পাদিত্য বসু আবির্ভাব হয় নরখাদক হিসেবে। এখনও সেই বাপ্পাদিত্য বসুরা সুযোগ পেলেই তুমুল নেচে যায়। আমাদের কিছুই করার থাকেনা। সারা দেশের মানুষ টিভিতে দেখলো সেই দৃশ্য। ক্ষমতার আশায় ভয়ংকর নরখাদকদের উৎসব।
আমাদের কিছুই করবার নেই। ২৮শে অক্টোবর আসে যায়। ছেলেটির মা হয়ত বাকি জীবন আর স্বাভাবিক থাকতে পারেনি। আমরা স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস প্রসব করি। তুচ্ছ অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করি। অর্থহীন এইসব অনৈক্য আমাদের আবার কোনও এক ২৮ শে অক্টোবরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
সেই অক্টোবর থেকে এই অক্টোবর, সেই কানিবালিজম, সেই মৃত একটি মানব শরীরের উপর দাপানোর যে দাপট, সেই দাপট কি এদেশের জন্য, এদেশের সাধারণ মানুষদের জন্য বিন্দুমাত্র সুফল এনেছে? দশটি বছর পর ওরা কি একটুও ভাবে যে, সেই ঘটনার তাণ্ডবলীলায় বাংলাদেশ আসলে কি পেয়েছে? কতটুকু এগিয়েছে? প্রশ্ন জাগে।


