বাংলাদেশে ধর্ষণের মহোৎসব : শেকড় কোথায়?

[author image=”https://scontent-sin6-1.xx.fbcdn.net/v/t1.0-1/c0.0.734.734/13882663_10209838761709430_2660497264205838333_n.jpg?oh=1c07e7faf32d1691c1af9e3438b81505&oe=58A82565″ ]ইলোরা জামান[/author]

child-rape

ইলোরা জামানঃ

বাংলাদেশে এখন ধর্ষণের মহোৎসব চলছে। বিভিন্ন বিকৃত উপায়ে শিশু ধর্ষণের সংবাদ নিউজফীডে আসছে, পত্রিকায় পড়ছি। ওগুলো মুদ্রণযোগ্য নয়। লিখবার ইচ্ছে নেই। তবে প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনষ্করা পড়বেন দয়া করে এবং প্রস্তুত থাকবেন যে সামনে এসবে আরো বেশি অভ্যস্ত হবার সময় আসছে। মানুষের মর্ষকামীতা আর যৌন উন্মাদনাকে সুযোগ দিলে তা দিনে দিনে শেষ সীমায় পৌঁছাবার তাড়না অনুভব করে। সেই তাড়না চায় আরো বিকৃতি। আরো বিভৎস উপায়ে সুখ। থাক সেসব কথা।

তবে এই সুযোগটি সৃষ্টি করছে কারা? কেন একদল মানুষের ভেতর এর ভয় নেই? যা ইচ্ছে করছে তা করে ফেলতে পারছে নির্দ্বিধায়? কারণ, সে জানে যে তার কিছু হবেনা। যখন একজন পটেনশিয়াল ক্রিমিনাল জেনে যায় যে সে ম্যানেজ করতে পারবে পুলিশ প্রশাসন সমাজ এবং সমাজপতিদের তখনই সে ফুল ক্রিমিনাল হয়ে উঠবার সাহস করে। অপরাধ ঢেকে ফেলা সহজ এইরকম একটি সমাজে বসবাস করা মানুষদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা প্রখর। এসব ধর্ষকামী কিংবা খুনিগুলো এই দুই উপায় তাদের মাথায় অবচেতনে ধারণ করে।

যারা একটি ঘেন্নাযুক্ত শব্দ ‘ধর্ষকের লিঙ্গ’ টিঙ্গ বলে চেঁচাচ্ছেন তাদেরকে আমার অবলা নারী মনে হতে থাকছে ইদানীং। আর হাসি পাচ্ছে। তারা সমস্যার মূলে যাচ্ছেন না। ধর্ষণের তাড়না পুরুষের লিঙ্গে থাকেনা, থাকে মাথায়। এবং সেই মাথাটা তৈরি করে এইধরণের সমাজ।

বিশেষ কোনো দল, বিশেষ কোনো গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাবানের হাতের মুঠোয় যে দেশের বিচার ব্যাবস্থা এবং যা তাদের সুবিধানুযায়ী পালটায় সেই দেশের এরকম একটি চিত্র দেখা অস্বাভাবিক নয়। যে দেশে নাগরিকের জীবনের উপর কোনো দল জোর খাটাতে পারে যখন তখন সেই দেশের হাল এরকমটিই হবে সেটি স্বাভাবিক। প্রভাব এবং প্রতিপত্তি যার আছে তার ভয়ে কিংবা দাপটে এখানে ন্যায়বিচার পাবার আশাকরা সম্ভব নয়।

পুরো দেশের চিত্র এখন এরকম। যার দল ভারী কিংবা যার কাছে বন্দুক অথবা অর্থ আছে সে জিতবে সবকিছুতে। স্বাধীনভাবে বিচার করার সুযোগ নেই এখানে। চাপ প্রয়োগ করে জিতে যাওয়া সহজ ব্যাপার এখানে। মহল্লার বখাটে গ্রুপের মত পুরো দেশজুড়ে এরকম মাস্তানি। এরা দলবদ্ধভাবে স্বাধীন নাগরিকের উপর খবরদারি ও মোড়লীপনা করবে এবং তাদের চাওয়াটাই তখন আইন। এত এত আইনবিদ আইনবিভাগ বিচার প্রশাসন এরা সব যেন এটাই অবধারিতভাবে মেনে নিয়েছে। পড়াশোনা কিংবা সুস্থ মাথায় চিন্তা করেনা কেউ। জোর যার বিচার তার। বাকি শিক্ষিতরাও পাড়ার মাস্তানগ্রুপের অধীন এবং সেই মতেই চলে।

সুশান্ত ইস্যুতে দেখুন। কতবড় একটি ইন্সটিটিউশন এই মাস্তানি ধারাকে প্রকাশ্যে দাপটে করে দেখালো। প্রচুর লোক সেটিকে সাপোর্ট করলো। কেউ নিজের গন্ডির বাইরে ভাবেনি। গত কয়েকদিন ধরে নিচের এই মন্তব্যটি বহুবার করছিলাম যে, ঢাবির এই জোর খাটানোর কালচার যা শুরু হয়েছে আগেই সেই কালচার কেন ভয়ংকর একটি দেশের জন্য। কিন্তু একজনও কি নিজের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন?

সুশান্তকে মানসিক রোগী হিসেবে দেখানো হচ্ছে, স্ট্যান্ড রিলিজ, এতসব কেবলমাত্র একটি স্ট্যাটাস কে ঘীরে, এগুলো চিন্তা করে দেখুন যে তারা মাস মাসল পাওয়ার দেখিয়েছে কিনা। আবেগের সাথে উত্তেজনাকর গরম অবস্থা কাজ করেছে কিনা। এবং সঠিক বিচার আইনগতভাবে হয়েছে কিনা। সুশান্ত যা বলেছে তা যদি মিথ্যে হয় তবে বিচার হবে, মিথ্যে প্রমাণ হবে, দ্যাটস ফাইন। কিন্তু অ্যাংরি মবের ইন্সট্যান্ট হম্বিতম্বি, ইমোশন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যখন দেশের বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হয় তখন সেই প্রশাসন নিয়ে বলবার অধিকারটুকুও আজ নেই যেন।

এগুলো হলো পাওয়ার দেখানো, দেশের একেকটি নাগরিকের বিরুদ্ধে। এগুলো নিজেকে ক্ষমতাধর এবং মাতব্বর হিসেবে দেখানো। এগুলোর জন্ম হিনমন্যতা থেকে। ঢাবির বাইরে বসে চিন্তা করুন বুঝতে পারবেন। এগুলো ইন্সটিটিউশনাল পাওয়ার ওভার আ সিটিজেন। ব্যক্তিকে কন্ট্রোল করবার একধরণের বিকৃত অত্যাচার। এসব বন্ধ হওয়া উচিৎ। সুশান্ত গোল্লায় যাক। সে ইস্যু নয়। ইস্যু হলো এসব ক্ষমতা আর লোকবলের দাপট দেখিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করার যে কালচার, সেটি।

এই মাতব্বরির রীতি এবং সেই রীতিকে মেনে নেয়ার যে রীতিনীতি সেটি না থামালে এভাবেই দেশ আরো অধঃপতনে যাবে। গ্রুপিং এবং দলপাকানোর স্বভাব বাদ দেয়া জরুরী। বিচারকে স্বাধীন করবার জন্য সবার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। নইলে এই ধর্ষণ, এবং অন্যান্য অপরাধ থামানো যাবেনা। এবং এই ভয়ংকর প্রচলিত ব্যবস্থার শিকার আপনিও যে হবেন না, তার গ্যারান্টি আছে কি?

লেখিকাঃ অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *