এন আই মাহমুদ: পল্লবীর আট বছরের শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়ে যখন মৃত্যুবরণ করল, গোটা দেশ শোকাহত হয়েছিল। সে সময় স্বাভাবিকভাবেই আইনের কাছে থেকে দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। আর ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল রোববার (৭ জুন) যে রায় ঘোষণা করেছে—দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড—তা নিঃসন্দেহে জনমনের প্রতিফলন। কিন্তু এই রায় ঘোষণার পরপরই যে আইনি প্রক্রিয়ার লম্বা প্রক্রিয়ার শুরু হয়, তাতে প্রশ্ন থেকেই যায়—সত্যিই কি গরীবের ভাগ্যে ইনসাফ থাকে? নাকি থাকে শুধু ট্রাইব্যুনালের রায় নামের এক আইওয়াশ?
রায় কার্যকরের আইনী প্রক্রিয়াটির স্পষ্ট ব্যাখ্যা সাধারণ জনতা জানেই না। ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও ভুক্তভোগীদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এটি চূড়ান্ত রায় নয়। আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদন ছাড়া এ রায় কার্যকর করা যায় না। অর্থাৎ এখন শুরু হচ্ছে ডেথ রেফারেন্স প্রক্রিয়া। মামলাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইকোর্টে যাবে। সেখানে হাইকোর্ট পুরো বিচারিক কার্যক্রম, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্ট—সবকিছু পুনরায় পর্যালোচনা করবে। হাইকোর্ট চাইলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারে, কিংবা আসামিদের খালাসও দিতে পারে।
এখানেই শেষ নয়। হাইকোর্টের রায়ের পর আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ আছে। আপিল বিভাগের রায়ের পর রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ আছে। আর সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে দণ্ডিত আসামির। অর্থাৎ একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এদিকে ভিকটিমের পরিবার—যারা হয়তো গরীব, অসহায়, আইনী খরচ জোগাতে অক্ষম—তাদের অপেক্ষার পালা আরও দীর্ঘায়িত হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত আর উকিলের কাছে যাওয়া আসার ভাড়াও যেন মড়ার উপ খাড়ার ঘা-এর মত হয়ে দাঁড়ায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই আইনি প্রক্রিয়া কি অভিন্নভাবে সব নাগরিকের জন্য সমান? উত্তরটি পরিষ্কার নয়। একজন ধনী আসামি শতকোটি টাকা খরচ করে দেশের সেরা আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারেন। তিনি প্রতিটি ধাপে আপিল, রিভিউ ও প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। অপরদিকে ভিকটিম পরিবার যদি গরীব হয়, তাহলে তাদের পক্ষে এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। আদালতের রায়ের কাগজ তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বটে, কিন্তু প্রকৃত বিচার পাওয়ার পথ এত দীর্ঘ ও জটিল যে তারা হারিয়ে যান।
সংবাদ মাধ্যমের মারফত জানা যায়, ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা বিচারাধীন। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর যন্ত্রণা এবং একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের অপেক্ষা। এই অপেক্ষা যেন চিরস্থায়ী না হয়ে ওঠে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হল, রায় ঘোষনার পর সবার দৃষ্টি সরে যায় নতুন ইস্যুতে। গরীব পরিবারের পাশে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি সহায়তা প্রদান, ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া, এবং বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা—এগুলো জরুরি পদক্ষেপ হলেও তা কেতাবে আছে গোয়ালে নেই – টাইপের কিছু সমাধান।
পল্লবীর শিশু হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার হয়েছে—মাত্র ১৭ দিনে। এটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন দ্রুত বিচার কি শুধু গণমাধ্যমের আলোচিত মামলার জন্যই সংরক্ষিত? অসংখ্য অখ্যাত গরীব পরিবারের শিশু নির্যাতনের মামলা বছরের পর বছর বিচারহীন পড়ে থাকে। সেখানেই ট্রাইব্যুনালের রায় শুধু নামের আইওয়াশ হয়ে ওঠে।
তাই বলতে হচ্ছে, শুধু রায় ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিচার কার্যক্রমের সংস্কার, সময়সীমা নির্ধারণ ও গরীব ভিকটিমদের পূর্ণ আইনি পৃষ্ঠপোষকতা। নইলে শিশুটির আত্মা শান্তি পাবে না, আর গরীবের ভাগ্যে ইনসাফ নামের বস্তুটি শুধু কাগজের গন্ধ হয়ে থাকবে। প্রকৃত ইনসাফ তখনই সম্ভব, যখন আইনি প্রক্রিয়ার এই জটিল জাল ভেদ করে দ্রুত ও সহজে ন্যায়ের আলো পৌঁছাবে প্রতিটি গরীবের দ্বারপ্রান্তে।
নিউজের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
