নবকণ্ঠ ডেস্ক: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর নেতৃত্ব নিয়ে সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি-এর অভ্যন্তরেই এখন তার পদত্যাগের দাবি প্রবল হয়ে উঠেছে। দলটির একাধিক এমপি ও মন্ত্রিপরিষদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে দাবি তুলেছেন, স্টারমারের উচিত দ্রুত সরে যাওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ-এর ঘনিষ্ঠরাও এখন এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছেন। এর ফলে সরকারের শীর্ষ পর্যায়েই স্পষ্ট বিভক্তি তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সোমবার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে ছয়জন পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারিকে (পিপিএস) সরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে কেউ সরাসরি পদত্যাগ করেছেন, আবার কেউ স্টারমারের বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়ে অবস্থান নেন। এই পদক্ষেপের পর দলীয় সংকট আরও প্রকাশ্যে চলে আসে।
মঙ্গলবার (১২ মে) ভোর পর্যন্ত লেবার পার্টির অন্তত ৭২ জন এমপি স্টারমারের পদত্যাগ অথবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরে যাওয়ার ঘোষণা দাবি করেছেন। একই দিনে সকালে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে ধারণা করা হচ্ছে, সেই বৈঠকেও নেতৃত্ব সংকট বড় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হতে পারে।
সোমবার পদত্যাগকারীদের তালিকায় ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং-এর পিপিএস জো মরিস। ওয়েস স্ট্রিটিংকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জো মরিস অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আর জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারছেন না এবং ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
এছাড়াও পদত্যাগ করেছেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি-এর পিপিএস মেলানি ওয়ার্ড, ক্যাবিনেট অফিসমন্ত্রী ড্যারেন জোনস-এর পিপিএস নওশাবাহ খান, এবং পরিবেশমন্ত্রী এমা রেনল্ডস-এর পিপিএস টম রাটল্যান্ড।
অন্যদিকে আরও দুইজন সরাসরি স্টারমারের বিদায়ের সময়সীমা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা হলেন পেনশনমন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেন-এর পিপিএস গর্ডন ম্যাকি এবং শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন।
ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যেও স্টারমার নিজের অবস্থানে অনড় থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এক ভাষণে তিনি বলেন, সমালোচকদের ভুল প্রমাণ করবেন এবং তিনি পদত্যাগ করছেন না। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, তার সরকার কিছু ভুল করেছে; তবে বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল বলেও দাবি করেন।
তবে তার এই বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেনি। বরং দলীয় ভেতরে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে অ্যান্ডি বার্নহাম-এর সমর্থকেরা স্টারমারের সরে যাওয়ার সময়সূচি নির্ধারণের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলছেন।
শুধু দলটির বামঘেঁষা অংশ নয়, ডানপন্থি অংশ থেকেও দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠছে। ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠ নেতারাও এখন স্টারমারের বিদায়ের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, এতে অ্যান্ডি বার্নহামের নেতৃত্বের দৌড়ে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ভয়াবহ ভরাডুবির পর থেকেই স্টারমারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র হয়। ইংল্যান্ডজুড়ে প্রায় দেড় হাজার কাউন্সিলর হারিয়েছে লেবার পার্টি। একই সময়ে রিফর্ম ইউকে-এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে এবং গ্রিন পার্টি অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস লন্ডনসহ বিভিন্ন এলাকায় লেবারের ভোটব্যাংকে বড় ধাক্কা দিচ্ছে।
শুধু ইংল্যান্ডেই নয়, ওয়েলসেও শত বছরের রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়েছে লেবার। এছাড়া স্কটিশ পার্লামেন্ট-এর ১২৯টি আসনের মধ্যে দলটি পেয়েছে মাত্র ১৭টি আসন, যা হোলিরুড নির্বাচনের ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হেক্সহামের এমপি জো মরিস এক বিবৃতিতে বলেন, লেবার কাউন্সিলর ও প্রার্থীদের এমন সিদ্ধান্তের দায় নিতে হয়েছে, যেগুলোর জন্য তারা দায়ী ছিলেন না। তার মতে, ভোটাররা আর বিশ্বাস করছেন না যে স্টারমার সেই পরিবর্তন আনতে পারবেন, যার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোট নিয়েছিলেন।
তিনি আরও বলেন, দেশ ও দলের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর উচিত দ্রুত সরে যাওয়ার একটি পরিষ্কার সময়সূচি দেওয়া, যাতে নতুন নেতৃত্ব জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে এবং সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়।
ইস্ট ওর্থিং অ্যান্ড শোরহামের এমপি টম রাটল্যান্ড বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির মধ্যেই নয়, পুরো দেশেই তার কর্তৃত্ব হারিয়েছেন এবং সেটি আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।
গিলিংহ্যাম অ্যান্ড রেইনহামের এমপি নওশাবাহ খান-ও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা হারিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনীতিতে তিনি এসেছেন ব্যর্থতা দেখে নীরব থাকার জন্য নয়, বরং এখন দলকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।
পিপিএস বা পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি হলো মন্ত্রীদের অবৈতনিক রাজনৈতিক সহকারী। সাধারণত একজন এমপিকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তারা মন্ত্রীদের রাজনৈতিক সমন্বয়ে সহায়তা করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন বলেন, স্টারমারের উচিত সেপ্টেম্বর অথবা তার কিছুদিনের মধ্যেই বিদায়ের একটি সুস্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা। একই সঙ্গে তিনি ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটি-কে সম্ভাব্য সব প্রার্থীকে নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
চলতি বছরের শুরুতে এনইসি অ্যান্ডি বার্নহামকে গর্টন অ্যান্ড ডেন্টনের উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়নি। যদিও লেবার পার্টির বহু এমপি তাকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের শক্তিশালী মুখ হিসেবে সমর্থন করছেন। তবে নেতৃত্বের দৌড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ নিতে হলে তাকে আগে এমপি হতে হবে।
স্থানীয় নির্বাচনের খারাপ ফলাফলের পর নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা হিসেবে শুক্রবার (৮ মে) এক ভাষণ দেন স্টারমার। সেখানে তিনি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণের ঘোষণাও দেন এবং এ বিষয়ে আইন আনার কথাও জানান।
তিনি বলেন, দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে গেলে দেশ বিশৃঙ্খলার মুখে পড়বে, যেমনটি অতীতে কনজারভেটিভরা করেছে।
অন্যদিকে লেবার এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট নেতৃত্ব নির্বাচনে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ডাউনিং স্ট্রিট সাময়িক স্বস্তি পায়। যদিও তিনি পরবর্তীতে স্টারমারের সেপ্টেম্বরে বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানান এবং অন্যদের নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন।
লেবারের সম্ভাব্য আরেক নেতৃত্বপ্রার্থী ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার এক সম্মেলনে বলেন, দল হিসেবে লেবারকে আরও ভালো করতে হবে। তার ভাষায়, ভোটারদের হতাশা শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই দূর করতে হবে। তিনি আবারও অ্যান্ডি বার্নহামকে পার্লামেন্টে ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
নিউজের ©সর্বস্বত্ব নবকণ্ঠ কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পূর্ণ বা আংশিক কপি করা বেআইনী , নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
