২০১২ বা ১৩ সালের কথা তখন থেকে টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় একটি স্লোগান প্রায়ই শুনতে পারা যায়, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দূর্গা উৎসবকালীন বিভিন্ন টেলিভিশনে এমন প্রচারণা দেখা যায়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এমন স্লোগান সম্বলিত ব্যানার ও দেয়াল লিখনও দেখা যায়। পরবর্তীতে প্রতি বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন উৎসবের সময় ঘনিয়ে এলেই এমন প্রচারণা চলতে থাকে। প্রথম দিকে এ নিয়ে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও একটা পর্যায়ে এটা নিয়ে মুসলিম ও ধর্মতত্ত্ববিদদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে। এমন প্রচারণায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রকাশ্য তেমন ভূমিকা দেখা না গেলেও মৌন সম্মতি অস্বীকার করা যায় না। মূলত হিন্দু সম্প্রাদয়ের চেয়ে অসম্প্রায়দায়িক রাজনীতি ও সেক্যুলার ভবাদর্শের কথা বলে থাকে এমন গোষ্ঠীকে দেখা যায় এই প্রচারনার অগ্রভাগে।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত ইসলামি স্কলারদের সর্বসম্মত মত হচ্ছে একজন মুসলিম কোন ভাবেই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কৃষ্টি-কালচার, বেশ-ভুষা অনুসরণ ও অনুকরণ করতে পারবে না। কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রাসূল (সাঃ) নিজে অত্যান্ত সতর্কভাবে এগুলো সর্বোতো ভাবে এড়িয়ে গেছেন। এমনি কি আব্রাহামিক ধর্মের সাধারণ বিষয় গুলো পালনের ক্ষেত্রে রাসুল(সাঃ) ভিন্ন নীতি অবলম্বন করতেন। যেমন তৎকালীন মদিনার ইহুদীরা পবিত্র অশুরার দিনে রোজা রাখতেন। এক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ) মুসলিমদের জন্য দুটি বোজা থাকার বিধান প্রবর্তন করেন যাতে ইহুদিদের অনুকরণ করা না হয়। তাছাড়া মুসলিমদের ইফতার, আজান, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত যাতে আহলে কিতাবদের ইবাদতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয় সেক্ষত্রেও সতর্ক থেকেছেন।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আরো দেখা যায় মুসলিমরা মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার পর সাহাবীরা সেখানকার অধিবাসিদের সেখানে দুটি উৎসব পালন করতে দেখেন। সাহাবীগণ ওই দুটি উৎসব পালন করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পালনের অনুমতি দেননি। বরং এর উত্তম বিকল্প হিসেবে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র দুটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উপহার দিয়েছেন। এ থেকে বুঝা যায় একজন মুসলিম এর জন্য অন্য ধর্মের উৎসবে অংশগ্রণ কোনভাবেই বৈধ নয়।
অপরদিকে চর্চিত হিন্দুধর্ম কিংবা সনাতন ধর্ম পর্যবেক্ষণ করলেও এমন স্লোগান নিতান্ত অবান্তর ও অবাস্তব বলে প্রতিয়মান হয়। কেননা ধর্ম যার যার উৎসব সবার এ স্লোগানের সাথে সুর মিলিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মুসলিমদের ঈদুল আযহায় গরু কুরবানী সহ অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে আমন্ত্রণ করা নিঃসন্দেহে একটি অতি সংবেদনশীল বিষয়। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী হিন্দু প্রাধান দেশ ভারতে মুসলমানদের পবিত্র কোরবানির উৎসবে হিংসাত্মক আক্রমণ ও বাধা দেয়ার ঘটনা প্রতি বছরই পরিলক্ষিত হয়। এমনকি গরু কোরবানীর দায়ে সে মুসলমানদের হত্যার স্বীকার পর্যন্ত হতে হয়। অথচ হিন্দুদের পুজা-পার্বনে ধর্ম যার যার উৎসব সবার স্লোগান যারা দেন তারা মুসলিমদের উৎসবের সময় রহস্যজনক নীরবতা পালন করেন।
এক্ষেত্রে হিন্দু সমাজের ভুমিকা অনেকটা যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া পড়শির ঘুম নাই এমন কথার মত। অর্থাৎ তাদেরকে অনুষঙ্গ করে একটি মহল এমন ঝামেলার সৃস্টি করা হয় যার দায় দিনশেষে অপ্রত্যাশিত ভাবে তাদের দিকে আপতিত হয়। দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে সোস্যাল মিডিয়ায় এমন কিছু ঘটনা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে ফেলছে যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট করছে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে তাদের আরো কঠোর হতে হবে যেন পরবর্তীতে তাদের উৎসবকে কেন্দ্র করে তৃতীয় কেউ এমন কোন অপ্রতিকর কথা বা কাজ যেন করতে না পারে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রক্ষার্থে হিন্দু-মুসলিম উভয়কে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। উভয় পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোর হলে কুচক্রীরা নিরস্ত হতে বাধ্য হবে।
লেখাঃ আইমান মুজাহিদ

