৭ নভেম্বর এর ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রাক্কালে আমার ভাবনা

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
14962921_10211405268471136_1196835655_n
বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর দেশের স্বাধীনতা ও সাবর্ভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের জাতীয় জীবনে ঘটেছে ;তার মধ্যে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এর কালজয়ী সিপাহী -জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি অন্যতম। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের অন্যতম বর্ষীয়ান নেতা স্বাধীনতার স্থপতি মরহুম শেখ মজিবর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর মরহুম খন্দকার মোস্তাক আহমেদর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গনের সাহসী খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে  রাজনৈতিক পট পরির্তনের কিছু দিন পর থেকে আধিপত্যবাদী অপশক্তির ইশারায় দেশকে অনিরাপদ করার লক্ষ্যে ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে একটি সামরিক অভু্যত্থানের মাধ্যমে রাস্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর একদল বিপথগামী সৈনিক ক্যাপটেন হাফিজ উল্লাহ এর নেতৃত্বে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এর র্নিদেশে বাংলাদেশর মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক তৎকালিন সেনাবাহিনীর প্রধান সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাক্তি পরর্বতিকালে বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্র নায়ক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আর্দশের প্রবক্তা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসে বন্দি করে দেশকে পুনরায় একদলীয় দুঃশাসনের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে। সেনানিবাসে জেনারেল জিয়ার বন্দির খবর বিদ্যুৎ গতিতে সবর্ত্র ছড়িয়ে পরে। সাধারন সৈনিক ও দেশবাসীর মনে ভয়ানক ক্ষোভের জন্ম দেয়। চারদিকে থমথমে পরিবেশের মধ্যে গোটা বাংলাদেশ হয়ে পরে অভিভাবকহীন। ইতিহাস বলে আমার প্রিয় মাতৃভুমি যেনো অনিশ্চিত ভয়াল সমুদ্রের মধ্যে দিকহারা হয়ে পরেছিল। এরই মধ্যে ভেতরে ভেতরে চলছিল ঘুরে দাঁড়াবার এক বিপ্লবী তৎপড়তা । জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দি দশা থেকে মুক্ত করে দেশের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবু তাহেরের নেতৃত্বে সেনাবাহীনির দেশপ্রেমিক সদস্যদের মধ্যে একটা গভীর ঐক্য সৃষ্টির নিভীর প্রচেষ্টা চলছিল । যদিও পরবর্তীকালে কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবু তাহের জেনারেল জিয়াকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল। যে কারনে কর্নেল তাহেরের সাথে জেনারেল জিয়ার মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় দুজন দুই মেরুতে অবস্থান নেয়। এর পরের ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। দেশের আপামর জনগন অপেক্ষায় ছিল ৭ নভেম্বরের কাঙ্ক্ষিত পরির্তনের। রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তন হতে লাগলো।দেশের মধ্যে ঘটে গেলো অনেক অনাকাংখীত ঘটনার । ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ ভোড় রাতে স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে প্রতিটি সেনাবাহিনীবাসে গর্জে ওঠে দেশপ্রেমিক সৈনিকদের কামান। কামানের গগনবিদারী আওয়াজে স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার প্রত্যয়ে জেগে থাকা দেশপ্রেমিক জনতা বেড়িয়ে আসে রাজপথে। নারায়ে তাকবীর -আল্লাহু আকবর ও বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শ্লোগানে আকাশ -বাতাস মুখরিত করে তোলে দেশপ্রেমিক জনতা। জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দি দশা থেকে মুক্তি পেয়ে নেমে আস জনতার কাতারে। সৃস্টি হয় বিপ্লবী সিপাহী -জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব ও সংহতি । কামানের গর্জন ঘোষনা করলো বাংলাদেশ কোন পরাভব মানেনা। আর এরই মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার সাধ গ্রহন করলো। যদিও ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসর্মপন করেছিল। পাকিস্তানের বিদায়ের মধ্য দিয়ে সহযোগিতার নামে ভারতের অনুপ্রবেশ ঘটে। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অপচেষ্টা চালায় ভারতীয় বাহিনী । যে কারনে সহরোওর্য়াদী উদ্যানে আত্মসর্মপন অনুস্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানিকে ষড়যন্ত্র করে আসতে দেওয়া হয়নি। পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজী ও ভারতের জেনারেল অরোরা আনুষ্ঠানিক আত্মসর্মপন দলিলে স্বাক্ষর করে। আর এ কারনে এখনো ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর তাদের ইস্টার্ন ভিক্টোরী ডে পালন করে আসছে। এটা বাঙালী জাতির জন্য অসম্মানজনক বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে। আর এ জন্য ১৯৭৫ এর ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহী -জনতার বিপ্লব ও সংহতির মাধ্যমে অর্জন কে বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
৭ নভেম্বরের এই বিপ্লব ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক অন্যান্য বিরল ঘটনা। এই ঐতিহাসিক বিপ্লবকে শুরু থেকেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে আধিপত্যবাদী অপশক্তির এদেশীয় দোসররা।
প্রতিপক্ষরা এটাকে সৈনিক হত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে সেই শুরু থেকে। তারা বার বার সিপাহী -জনতার এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের চেতনায় আঘাত হানার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ইতিহাসের মূল্যায়ন , সেদিন যদি সিপাহী -জনতার বিপ্লব সংঘটিত না হতো ;তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতো। আজ যারা এই দিনটির বিরুদ্ধে কথা বলে ;তারা মূলত দেশ ও জাতীর প্রতিপক্ষ অপশক্তি এবং দুশমন । র্বতমান আওয়ামীলীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ঐক্যমতের সরকারের নামে আর্দশীক শত্রুদের সাথে আতাত করে রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লবের রাস্ট্রীয় ছুটি বাতিলের ব্যাপারে কথার সুত্রপাত করলে ; দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সরকারের এই অন্যায় ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ করে আসছিল । এ সময় ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবস সংক্রান্ত বিষয়ে দৈনিক দিনকাল ও দৈনিক সংগ্রামে আমার লিখা একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। এ প্রবন্ধের এক জায়গায় আমি লিখেছিলাম, অভিজ্ঞ মহলের ধারনা যদি ৭ নভেম্বরের ছুটি বাতিল করা হয় ; তাহলে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। প্রকাশিত প্রবন্ধের এই অংশটাকে কেন্দ্র করে ১২ আগষ্ট ১৯৯৬ আমাকে সরকারের
র্নিদেশে সিটি এস বির একটি বিশেষ টিম আমার মতিঝিলের অফিস
থেকে গ্রেফতার করে। নাশকতার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক করে তোলার অভিযোগ এনে আমাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরন করে। পরর্বতিতে আমাকে তিন মাসের আটকাদেশ প্রদান করা হয়। এ সময় রিমান্ডের নামে মতিঝিল থানায় আমার উপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক র্নিমম র্নিযাতন  । সেই র্নিযাতনের কষ্ট আজও বহন করে চলছি। স্বনামধন্য আইনজীবী ব্যারিস্টার সাহাদাৎ হোসেনের মাধ্যমে আমার অনুজপ্রতিম বন্ধু  ও সহযোদ্ধা বৃটেন প্রবাসী সাংবাদিক ইন্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিমের দ্বারা রিট পিটিশেনের আবেদনের প্রেক্ষিতে মাননীয় হাইকোর্ট তৎকালিন আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে আমার আটকাদেশের বিষয়ে রুলনীশী জারি করে এবং সর্বশেষ জামিনে মুক্তি লাভ করি।
সে সময় আমার মতো অনেক সংবাদকর্মী , রাজনীতিবীদ ও রাজনৈতিক সর্মথক শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকারের চরম র্নিযাতনের শিকার হয়েছেন। আজ সেই ফ্যাসীবাদী অগণতান্ত্রিক সরকার রাস্ট্রীয় ক্ষমতায় । তারা ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের ঐতিহাসিক দিনকে তাদের নিপাত যাওয়ার শক্তি মনে করে। যে কারনে তারা ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক দিনের যে কোনো অনুস্ঠান বানচালের ঘোষনা দিয়েছে। সে কারনে এই ফ্যাসীবাদী ঘোষনার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে জাতিসত্তা বিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্রের হাত থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে ৭ নভেম্বরের ঘোষিত সমাবেশ পালনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসীবাদ বিরোধী আন্দোলনকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে হবে। সমুন্নত রাখতে হবে ৭ নভেম্বরের বিপ্লবী চেতনা। জোটবদ্ধ উচ্চারন করতে হবে বাংলাদেশ কোনো পরাভব মানেনা।

লেখকঃ প্রবাস থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.