সৌহার্দের পরিবেশ রক্ষার্থে ভোট চাই ভোট চাই রাজনীতি, আদর্শের খাতা এখন বন্ধ

মাহবুব আরিফ (কিন্তু)-সুইডেন।

১৯৭১ সাল, সময় তখন থেমে থাকেনি, দুর্বার আন্দোলনের সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ দিল ৩০ লক্ষ মানুষ, তাদের রক্তের উপর দাড়িয়ে আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উপর ভিত্তি করেই মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিকতাও ঠিক সেই ভাবেই প্রস্তুত ছিল জয় করে এনেছিলো বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা |

তারপর ? আজ ৪৭ বছর পর রাজনীতিতে অতিমাত্রায় ধর্মীয় আবেগ প্রকাশের কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা হুমকির মুখে পরে যাচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে পর্দার আড়ালে রাজনীতিতে নেতা নেত্রীদের ধর্মীয় অনুভূতির বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের বাংলাদেশকে ঠিক উল্টো পথে ধাবিত করছে , শাফি হুজুর ও জুনায়েদ বাবুনগরীর মতো ধর্মীয় নেতাদের আবির্ভাব আর তাদের হাতেই জিম্মি হয়ে পরেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ, স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ৭২ সালের তৈরি করা সংবিধান।

জনগণ যে মহৎ কাজটি রাজনীতিবিদের কাছ থেকে আশা করেছিল সেটা হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নিরাপদে বেঁচে থাকা কিন্তু উন্নয়নের ভিডিও আর পদ্মা সেতুর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন রাষ্ট্র নাম একটি বাংলাদেশ, তিস্তার পানির মতো শুকিয়ে যাচ্ছে আমাদের আশা ও আকাঙ্খা, ধর্মান্ধতা আজ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। অপারেশন করে টিউমার সরানো যায় বটে ভাইরাস সরানো যায় না, ভাইরাস নিধনে চাই সঠিক মাত্রার পেনিসিলিন বা প্রতিষেধক ।

জামা-শিবিরের রাজনীতি শুধু একটি দলেই সীমাবদ্ধ নয় , দলে দলে জামাত-শিবিরদের জায়গা হয়ে যাচ্ছে স্বাধীনতার স্বপক্ষের দলগুলোর ভেতরে, প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষরাই হয়ে যাচ্ছে হাইব্রিড, ধর্মান্ধতার বিষ বাষ্পে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর রাজনীতিবিদরা সেই জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার অংক কষছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন সংযোজনা মদিনা সনদ, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে স্পষ্ট করেই বলেছেন বাংলাদেশ মদিনা সনদের আলোকেই পরিচালিত হবে, ধরে নিতে পারি মদিনা সনদ একটি সর্ব প্রথম মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে একটি লিখিত আইন কিন্তু এই আইনের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে আল্লাহতাআল্লার হুকুমে আল্লাহর নবী রাসূল (সাঃ) কর্তৃক প্রণীত একটি সংবিধান, এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় যে, একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ধর্মীয় অনুভূতি সম্বলিত একটি আইনের আলোকেই কি ভাবে পরিচালিত হয় ! স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ নাগরিকরা আজ নির্বিকার, রাজনীতিবিদের এ ধরণের বক্তব্য ধর্মান্ধতাকে আস্কারা দিয়েছে, ক্ষমতাকে আগলে রাখার একটি অপকৌশল। ধর্ম যে আমাদের সমাজকে আস্তে আস্তে গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে তার একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ২০১৭, পৃথিবী যেখানে মানুষের অধিকারকে নিশ্চিত করতে মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে আর বাংলাদেশ শিশুদের অধিকারকে খর্ব করছে, আলেম-উলামাদের জন্য আলাদা ভাবে অর্থনৈতিক জোন করা হচ্ছে।

যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের সর্বাধিক নজর দেয়া উচিত ছিল সেটা হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশে দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা বা আধুনিকায়ন ও নিয়ন্ত্রণ। সেটা চেষ্টা করেও করা গেলো না। বাল্য বিবাহ আইন পরিবর্তন করা হলো, ধর্মীয় আদলে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হলো, কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স (আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ) সমমান দেওয়া হলো, বোর্ডের নাম হলো আল-হাইয়াতুল উলাইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ | আওয়ামী লীগের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ২০১৭ সালে দলের মঙ্গলশোভা যাত্রা বন্ধ ঘোষণা করলো, দাবী আসলো সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ভাস্কর্যের নির্মাতা ভাস্কর মৃণাল হকের সৃষ্টিকে অপসারণের, যে লোক নারীকে তেতুল তুলনা করে মুখ দিয়ে লালা ঝরায়, তাকে খুশী করতে ভাস্কর্যও মূর্তি হয় গেল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রক ছয়টি বোর্ডের প্রতিনিধিদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, দাবীর সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী ভাস্কর্য সরাতে বলবেন প্রধান বিচারপতিকে !

আজ অনেক দিন পর রাজনীতির রূপ পাল্টে যাচ্ছে বা পাল্টানো হচ্ছে, রাজনীতিতে এখন বন্ধুত্বপূর্ণ সৌহার্দের পরিবেশ রক্ষার্থে ভোট চাই ভোট চাই রাজনীতি, আদর্শের খাতা এখন বন্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ শুধুই গল্প | সবার জন্যে শুভ কামনা রইলো, ভাল থাকুন, ভাল থেকো বাংলাদেশ | জয় বাংলা |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.