[author ]সাইফুল্লাহ মনসুর[/author]
স্বাধীনতা-উত্তর দেশে যে বড় ধরনের ডাকাতি হয়েছে সে অর্থে রাজধানীতে কোনো ব্যাংক ডাকাতি হয়নি। সে সময়ের চেয়ে এখন অস্ত্র অনেক আধুনিক হয়েছে। অপরাধীও দুর্র্ধষ হয়েছে। কিন্তু দুর্র্ধষ অপরাধীরাও অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে রাজধানীতে রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংকে হামলা করেনি, ডাকাতি করেনি। ব্যাংক ডাকাতির দুর্নাম সরকারের সাথে যুক্ত হয়নি; কিন্তু ব্যাংক ডাকাতি দুর্নাম যুক্ত হয়নি, তবে তার চেয়েও অনেক বড় ব্যাংক লুট বলতে গেলে এখনই প্রথম হচ্ছে। ব্যাংক ডাকাতি একটা হতেই ব্যাংক ডাকাত জেলে যায়। কিন্তু ব্যাংক লুটেরারা জামাই আদরে আছে। অর্থমন্ত্রী গত ২৫ জুন ২০১৫ ঈসায়ী জাতীয় সংসদে বলেছেন, বেসিক ব্যাংকের অর্থ লুটে তিন কর্মকর্তা জড়িত।
বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের সিলেট জিন্দাবাজার থেকে ভুয়া এফডিআরের মাধ্যমে ২ কোটি ৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় ৩ কর্মকর্তার নাম অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছে। কিন্তু এছাড়া গত ৫-৬ বছরে বেসিক ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। কারা এই বিশাল টাকা লুটপাট করেছে তা কিন্তু অর্থমন্ত্রী আজ পর্যন্ত বলেনি। ২ কোটি টাকা লুপাটকারীর নাম অর্থমন্ত্রী বলতে পারে কিন্তু ৯ হাজার ৯শ’ ৯৮ হাজার কোটি টাকা লোপাটকারীর নাম অর্থমন্ত্রী বলতে পারেন না কেন? তাদেরকে অর্থমন্ত্রী চেনেন অথবা তারা তার ঘনিষ্ঠজন বলে? তাদের সাথে অর্থমন্ত্রীর দহরম আছে বলেই কি দুই কোটি টাকার তথ্য মিললেও তার ভাষায় ৪ হাজার কোটি টাকার অংক কোনো টাকাই নয়।
শুধু বেসিক ব্যাংকই নয়, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক থেকেও আরো বিশ, ত্রিশ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। লুট হয়েছে। এ টাকা কি অর্থমন্ত্রীর বাপের টাকা? অর্থমন্ত্রী অর্থনীতি বুঝেন? অর্থমন্ত্রী কি মন্ত্রী হওয়ার যোগ্য? ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা, অর্থমন্ত্রী সাহিত্যের কল্পনা বিলাসী দিয়ে দেশের অর্থ লুটেরাদের হাতে তুলে দেশ ও দেশবাসীকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে; সে বিষয়ে সরকারের টনক নড়বে কবে? সরকার না জনগণের বলে নিজেদের দাবি করে? কিন্তু জনগণের ব্যাংকের টাকা লুটের বিপরীতে সরকারের নীরব দর্শকের ভূমিকা কী পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফরের ভূমিকার মতোই হচ্ছে না?
যে দেশের দশ কোটি লোক দরিদ্র; এক তৃতীয়াংশ মানুষ দু’বেলা খাবার খেতে পারে না সেদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে লুট হয় কিভাবে? অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে রাষ্ট্রের সক্রিয় সহযোগিতা ব্যতীত বড় ধরনের দুর্নীতি কখনোই সম্ভব নয়। সরকার কি এ অভিযোগ থেকে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে?
ব্যাংক ডাকাতি হলে ভল্ট থেকে একবারেই টাকা লোপাট হতো। সারাদেশ গরম হয়ে যেত। কিন্তু ব্যাংক লুট ধারাবাহিক হওয়াতে তা কি সরকারের সহনীয় হয়ে গেছে? লুটের টাকা উদ্ধারে এবং লুটেরাদের শায়েস্তা না করে সরকার কী নিজেদেরই অপরাধী প্রমাণ করবেন? সরকার কি মনে করে এসব কথা জনসাধারনের কেউ তৈরি করছে?
যানজট সমস্যা নিরসনে ব্যর্থ সরকারের কী হর্নের আওয়াজে বধির হয়ে গেছে? অথচ সরকারের গৃহপালিত বিরোধীদলও এখন জাতীয় সংসদেই উচ্চারণ করছে শেয়ারবাজার, ব্যাংক তথা জনগণের টাকা লুটপাট হচ্ছে।
গত ২৫ জুন ২০১৫ ঈসায়ী ইয়াওমুল খামীস বা বৃহস্পতিবার সরকারের গৃহপালিত বিরোধীদল জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দীন বাবলু বলেছে, “দেশে সুশাসন নেই। জবাবদিহিতা নেই। যার কারণে জনগণের টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। যারা এ টাকা লুটপাট করছে এখন পর্যন্ত তাদের নাম বের হলো না। অনেকগুলো কমিটি হয়েছে, হলমার্ক, ডেসটিনি যে লুটপাট করেছে তা নিয়ে তদন্ত রিপোর্ট ও পরিষ্কার হয়নি। গত ৩ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে সে বলেছে, ‘আপনারা সরকারে আছেন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য, জনগণের টাকা লুটপাট করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য নয়। লুটপাট যেন না হয়, সেটি বন্ধ করার জন্যই আপনারা আছেন। এ পর্যন্ত যত কমিটি করেছে, তাতে কিছুই করতে পারেনি। একটি টাকাও আদায় করতে পারেনি। যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি। একদিন আপনাদের এর জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ শুধু কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা যাবে না।’
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জনগণের উন্নয়ন না হলেও ব্যাংক লুটের দ্বারা সরকারের বেনিফিসিয়ারীদের ঠিকই মহাউন্নতি হচ্ছে। এরা হলমার্কের মতো কেলেঙ্কারী না করলেও এরা যে কায়দায় ব্যাংক সুবিধা নিচ্ছে তা নিয়মবহির্ভুত এবং মূলত তা প্রকাশ্যই ব্যাংক লুটপাট। উদাহারণত- বেক্সিমকো ও থার্মেক্স গ্রুপ মোট ৩ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের আবেদন করেছে। বলাবাহুল্য, সরকারের সবুজ সংকেতেই তারা এরূপ করতে পেরেছে। তাই তাদের আবেদন গৃহীত হয়েছে এবং কবুল হতেও সময় লাগবে না এবং তা মূলত ইতিহাসে ব্যাংক লুটের আরেক অধ্যায় বলে বিবেচিত হবে। অথচ ঋণ উদ্যোগীরা একশ-দুশ কোটি নয়; এক-দুই কোটি টাকারও পুনঃতফসীলের গ্যাঁড়াকলে গড়িয়ে নিঃশেষ হয়। তাদের বেলায় নিয়মের বালাই ষোলো আনায় আঠারো। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপীদের ক্ষেত্রে নিয়মের বালাই নেই। নিয়ম এখন সরকারের নেক নজরে পরিণত হয়েছে। সরকারের নেক নজরে থাকার কারণেই এখন হরেক কায়দায় ব্যাংক লুট হচ্ছে।
শুধু হলমার্ক কায়দায়ই নয়; বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি তরিকায় নয়, বেক্সিমকো পদ্ধতিতে নজীরবিহীন কায়দায় পুনঃ তফসীলিকরণ নয়; পাশাপাশি ভুয়া এফ.ডি.আরের মাধ্যমেও হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী গত ২৫ জুন ২০১৫ ঈসায়ী ইয়াওমুল খামীস বা বৃহস্পতিবার বলেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংক হতে ভুয়া এফডিআরের বিপরীতে ৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের খবর পত্রিকায় বের হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
প্রসঙ্গত, ভাত একটা টিপলেই চলে। অর্থমন্ত্রীর এ কথায় আবারো বোঝা যায় কেন বর্তমানে অবাধে ব্যাংক লুট হচ্ছে? কিন্তু কয় টাকা লুট হচ্ছে তার প্রশ্নের জবাব দেয়ার দায় জনগণের। কারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের টাকা জনগণের টাকা। জনগণ মালিক। মালিক যদি তার সম্পদের হিসাব না রাখে, হিসেব না চায়, নয়-ছয়ের বিরুদ্ধে ক্ষেপে না যায়; তহবিল তসরুপকারীদের বিরুদ্ধে উদ্যোগ না নেয় তবে তার ফল তাদেরই ভোগ করতে হবে। প্রসঙ্গত, মহান আল্লাহ পাক ওই জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না; যে জাতি নিজেরা নিজেদের ভাষ্য পরিবর্তন করে না।
