দেশবরেণ্য শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ এর অর্জন Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres

shahab uddinশাহাবুদ্দিন আহমেদ (জন্ম: ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০) বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত একজন বিখ্যাত বাঙালী চিত্রশিল্পী। আধুনিক ঘরানার প্যারিস-প্রবাসী ফরাসী-বাঙালী এই শিল্পীর খ্যাতি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯২ সালে মাস্টার পেইন্টার্স অব কনটেম্পোরারী আর্টসের পঞ্চাশজনের একজন হিসেবে বার্সেলোনায় ‘অলিম্পিয়াড অব আর্টস’ পদকে ভূষিত হন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। এছাড়া ২০১৪ সালে চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres’ উপাধি লাভ করেন।

 

শাহাবুদ্দিন, যিনি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর চিত্রকলায় সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতিতে দুর্দমনীয় শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য গতির ইংগিতময় অভিব্যাক্তির জন্য সুপরিচিত। তিনি মনে করেন, মানুষের মুক্তিযুদ্ধ অদ্যাবধি চলমান, এবং রং ও তুলির দ্বৈত অস্ত্র সহযোগে তিনি এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে চলেছেন। সত্তরের দশকের প্রারম্ভে বাংলাদেশে বিমূর্ত চিত্রকলার যে দুবোর্ধ্য পর্বের সূচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে গাঁটছড়া না বেঁধে তিনি নির্মাণ করেন স্বকীয় শৈলী, যার ভিত্তিতে রয়েছে শারীরিক প্রকাশভঙ্গী। তাঁর এই চিত্রশৈলী বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

প্রারম্ভিক জীবন

তার পৈত্রিক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার আলগী গ্রামে হলেও তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে শাহাবুদ্দিনের বাবা তায়েবউদ্দীন প্রধান ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর মায়ের নাম সাইফুন্নেছা আহমেদ। ব্যক্তিগত জীবনে আনা’কে বিয়ে করেন শাহাবুদ্দিন আহমদে। সংসারে আছে তার দুই মেয়ে – চিত্র ও চর্চা।

শিল্পী শাহাবুদ্দিন ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাশ করেন ফরিদউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। তিনি ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টসে পড়াশোনা করে বিএফএ ডিগ্রী অর্জন করেন। ঐ বছরই ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীতে চারুকলায় ফ্রান্স সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বৃত্তিলাভ করে ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ইকোল দে বোজার্ট চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে অদ্যাবধি প্যারিসে কর্মরত আছেন।

চিত্রকলায় অবদান

বড় ক্যানভাসের পর্দায় গতিশীল ও পেশীবহুল অতিমানবীয় পুরুষের ছবি আঁকতে ভীষণ পছন্দ করেন শাহাবুদ্দিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে উপজীব্য করে রংয়ের তুলির সাহায্যে যথাযথ উপস্থাপনা, প্রতিস্থাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো সার্থক ও সফলভাবেই সম্পন্ন করেছেন তিনি। এছাড়াও, শাহাবুদ্দিনের তুলিতে নারী চিত্রকর্মগুলোয় তাদের চিরায়ত কোমলতা, দ্যুতির স্পন্দন ও স্নিগ্ধতা দেখা যায়। মিহি কাপড়ের মাধ্যমে নারীকে আবৃত করে শারীরিক সৌন্দর্য্যের দ্যূতি তুলে ধরেন তিনি, যাতে রমণীর অলৌকিক ও অসীম শক্তি বিচ্ছুরিত হয়।

চিত্র প্রদর্শনী

দেশ-বিদেশের অনেক গ্যালারীতে তাঁর একক ও যৌথভাবে চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়। তন্মধ্যে একক প্রদর্শনী হিসেবে- ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্তদেরকে অর্থ সাহায্যের জন্য ঢাকায় চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে চিত্র প্রদর্শনী; হল্যান্ড, পোল্যান্ড, সেনেগাল, বেলজিয়াম এবং ভারত-সহ সুইজারল্যান্ডের লুসানে অবস্থিত অলিম্পিক মিউজিয়াম এবং ফ্রান্সের বোর্গ-এন ব্রেজ মিউজিয়ামে বৈশ্বিকভাবে প্রদর্শন অন্যতম।

যৌথ প্রদর্শনী হিসেবে, ঢাকায় সেঁজুতির প্রথম চিত্রকলা প্রদর্শনী ও ভাষা আন্দোলন উপলক্ষ্যে চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিসে অধ্যয়নরত শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, প্যারিসে ইউনেস্কো আয়োজিত আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী, চীনে বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলা প্রদর্শনী, বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে গ্যালারী কনট্রাস্টে চিত্র প্রদর্শনী, ভারতের মুম্বাই এ “দি হারমোনী শো”, ইতালি ও কিউবাতে চিত্র প্রদর্শনী এবং প্যারিসে “সিগার দ্য লা হাভানা আ হরিজন ২০০০” চিত্র প্রদর্শনী অন্যতম।

শাহাবুদ্দিন আহমেদের বিভিন্ন চিত্রকর্ম বাংলাদেশ সহ বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রখ্যাত গ্যালারী, বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত আছে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন শিল্পী সাহাবুদ্দিন আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন। সহযোদ্ধা হিসেবে তাঁর সাথে ছিলেন- ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা এবং পপ সম্রাট ও গুরু আজম খান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড গতি, শক্তি, জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে সম্মুখ অগ্রসর হবার কারণে তিনি তার ছবিতে গতিকে প্রাধান্য দেন বেশী।

পুরস্কার ও সম্মাননা

চারু ও কারুকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশে অনেক পুরস্কার লাভ করেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ।

ক্রমিক নং    পুরস্কারের নাম ও মান    সাল    পুরস্কারের বিবরণ

(১) ১৯৬৮ সালে শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী হিসেবে রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক,

(২) ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক,

(৩) ১৯৭৫ সালে প্যারিসে অধ্যয়নরত শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীতে ১ম পুরস্কার,

(৪) ১৯৭৯ সালে প্যারিসে আয়োজিত ৩১টি দেশের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীতে ১ম পুরস্কার,

(৫) ১৯৮০ সালে ইউনেস্কো আয়োজিত আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনীতে ১ম পুরস্কার,

(৬) ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক আয়োজিত নবীন শিল্পী চারুকলা প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার,

(৭) ২০০০ সালে চারুকলা ক্ষেত্রে গৌরবময় ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার,

(৮) ২০১৪ সালে চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের এই সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres’ অর্জন।

Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres উপাধিতে ভূষিত দেশবরেণ্য শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ এর সাথে একটি একান্ত সাক্ষাতকারে ফুটে উঠেছে এই সুনামধন্য শিল্পীর কর্ম-দর্শন ও মনের কথা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নবকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি খন্দকার জামিল আবেদ।

নবকণ্ঠ: কেমন আছেন স্যার ?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: ভাল আছি…

নবকণ্ঠ: চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্স সরকার আপনাকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। এ প্রাপ্তিতে আপনার অনুভূতি কেমন?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: এটা নি:সন্দেহে অনেক আনন্দের, গর্বের ও অহংকারের। তবে এই আনন্দ শুধু আমার একার নয়। এই আনন্দ আর প্রাপ্তি পুরো বাংলার। আমার দেশের ১৬ কোটি মানুষের।

নবকণ্ঠ: আপনার চিত্রকর্মের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: সেই ছোট বেলা থেকেই। পড়ার টেবিলে বসে শুধু ছবি আঁকতাম। হাতের কাছে যখনই কিছু পেতাম আমি তা দিয়ে ছবি আঁকতাম। ছবি আঁকার প্রতি আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল, এখনও আছে। কত যে বাবার বকুনি খেয়েছি তার হিসেব নেই, তবে মা আমার এই ইচ্ছেটাকে অনেক গুরুত্ব দিতেন। চিত্রশিল্পের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ দেখে, মা অনেক খোঁজা-খুঁজি করে আমাদের পাশের গ্রামের একজন চিত্রশিল্পীকে আমার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। তবে মজার বিষয় হলো, আমার সেই চিত্রশিল্পীর বাসায় যখন প্রথম যাই সেদিন বৃষ্টি ছিল। ওনার ঘরের উপরের ছাদে/চালে ফুটো থাকাতে বৃষ্টি হলে তা দিয়ে পানি পড়ত। বাড়ি ফেরার পর সবাই আমকে বলল, “তোর চিত্রশিল্পী হওয়ার দরকার নেই, কারণ চিত্রশিল্পীরা গরীব হয়”। এ কথাটি আমার খুব মনে পড়ে; মূলত মা’র হাত ধরেই আমার যাত্রা শুরু, তিনিই আমার অনুপ্রেরণা।

নবকণ্ঠ: আপনার ফ্রান্সে আসা এবং বসবাস করার পটভূমিটা বলবেন কি?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আসলে সত্যি কথা বলতে কি দেশে বাহিরে আসার কোন ইচ্ছে আমার ছিলনা। আমি নিউজিল্যান্ডে প্রথম স্কলারশিপ পেয়েছিলাম, তবে যাইনি। কিন্তু বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু’র একটি কথাই আমার দেশের বাহিরে আসার ক্ষেত্রে অনেকটা কাজ করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আর্ট কলেজের বিষয়ে কথা বলার জন্য আমি তাঁর সাথে একবার দেখা করতে গেলাম। সেদিন তিনি আমকে বললেন, “তুই তো ভাল ছবি আঁকিস, তোকে কিন্তু অনেক বড় হতে হবে”- এই কথাটি বলেই  কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, “তোকে ফ্রান্সে যেতে হবে। পিকাসো কে মার দিতে কি পারবিনা? আর তুই তো একজন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধারা সব পারে”। তখন আমিও বলে ফেলেছিলাম, “জ্বী, পারব”। মূলতঃ এজন্যই আমার ফ্রান্সে আসা। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন, আজকের বাংলার রূপকার, তাঁর জন্যই আমরা আজ স্বাধীন।

নবকণ্ঠ: আপনি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যে চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন তার কতটুকু বাস্তবে রূপ নিয়েছে বলে মনে করেন?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: যদি এক কথায় বলি তাহলে বলতে হবে একটুও না। যে বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম সেই বাংলাদেশ আমরা পাইনি। তবে হ্যাঁ, পেতাম, যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হত। আমি সেইদিন বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম যেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল, আর কষ্ট পেয়েছিলাম যেদিন দেখলাম আমার স্বাধীন দেশে দুইজন রাজাকার মন্ত্রী হয়েছিল। আমার প্রশ্ন হল, যারা আমার দেশকে স্বীকৃতি দেয়না তারা কি করে মন্ত্রী হয়? মাঝের দিকে তো বাংলাদেশের অবস্থা অনেক খারাপ ছিল কিন্তু এখন অনেকটা ভাল’র দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

নবকণ্ঠ: আপনি তো বাংলাদেশেও চিত্রশিল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং এখন ফ্রান্সেও একই পেশায় আছেন। বাংলাদেশের চিত্রশিল্প আর এখানকার চিত্রশিল্পের মধ্যে কি পার্থক্য দেখতে পান?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: বিশাল পার্থক্য। ফ্রান্সকে বলা হয় শিল্পের নগরী তারা আমার দেশ থেকে সব দিক থেকেই অগ্রগামী ও উন্নত। আমাদের দেশের মানুষদের খাবার থেকে শুরু করে সব কিছুর জন্য চিন্তা করতে হয়, কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা অনেক ভাল করছে।

নবকণ্ঠ: আপনি দেশে-বিদেশে অনেকেরই প্রিয় চিত্রশিল্পী। সেক্ষেত্রে আপনার প্রিয় চিত্রশিল্পী কে?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: জয়নুল আবেদীন, তাঁর ভাবনা, রং তুলির ছোয়ায় যে ছবি আঁকেন তাতে একটি গতি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও তাঁর প্রতিটি  ছবিতে প্রাণ আছে সত্যি কথা বলতে অসাধারণ। আমি সেই ছোট বেলা থেকেই তাঁর খুব ভক্ত। তিনিই আমার প্রিয় শিল্পী।

নবকণ্ঠ: মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আপনার আবেগ বা অনুভূতি কেমন?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমি শুধু এটুকুই বলব, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করা হয়েছিল আর আমার সে যুদ্ধে অংশগ্রহন করার সৌভাগ্য হয়েছিল, যার জন্য আমি খুবই গর্বিত।

নবকণ্ঠ: কোন ধরনের ছবি আঁকতে আপনার  সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: গতিময় ছবি আঁকতেই আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে, কারণ গতিই জীবন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার, গতি আর মানুষের ছবিই বেশি আঁকা হয়েছিল। আসলে আমার জীবনটাই একটা গতিময় জীবন। আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে, সেখানেই আমার শৈশব কেটেছে। বর্ষার সময় আমি মেঘনা পাড়ের চকিতে শুয়েছি, সেখানে বসে আমি পুটি মাছও ধরেছি। সময়ের সাথে সাথে আমাদেরকেও বদলাতে হবে তবে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়।

নবকণ্ঠ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমার নিজস্ব একটি জাদুঘর করার পরিকল্পনা, যেটা আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। সেখানে শুধু আমার আঁকা ছবিই থাকবেনা, সেখানে আমার দেশের নতুন প্রজন্মের আঁকা ছবিও থাকবে। ইচ্ছে ছিল সরকারী ভাবে এই জাদুঘরটি করব, কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতির যে অবস্থা তাতে সম্ভব না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি নিজেই করব। এসব দেশে অনেকেরই নিজস্ব জাদুঘর আছে। লন্ডন, স্পেন, জার্মানী বা ইতালিতেও  অনেকেরই নিজস্ব জাদুঘর আছে। আমি জাদুঘরের জন্য ইতিমধ্যে জায়গাও নিয়ে নিয়েছি।

নবকণ্ঠ: নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন কি?

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: শিকড়, যা কিনা খুবই গুরত্বপূর্ণ। আমরা পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন, বসবাস করি না কেন আমরা কিন্ত বাংলাদেশীই। আর এটাই আমাদের প্রথম পরিচয়। আমাদের রিকশা, আমাদের দেশীয় ফল আম, জাম, কাঠাল ইত্যাদি। আমরা ইচ্ছে করলেই অন্য দেশের দামী ব্রান্ডের গাড়ি চালাতে পারি, অন্য দেশ থেকে আমরা বিভিন্ন ফলের চারা আমদানি করে তার চাষও করতে পারি কিন্তু অবশ্যই আমাদের শিকড়কে প্রথমে রেখে। নতুন প্রজন্মকে বলব, “তোমরা নিজ দেশের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখবে, অন্যথায় আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।”

নবকণ্ঠঃ আপনার সাথে কথা বলে অনেক ভাল লাগলো। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাদেরকে আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য…।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের শিল্পী, আমাদের চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ ফ্রান্সের ‘Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres’ উপাধি লাভ করেছেন। এই উপাধি আগে বহুভাষাবিদ ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং মুকাভিনয়শিল্পী পার্থপ্রতিম মজুমদার পেয়েছেন। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলেও আগামী সেপ্টেম্বরে নাইট উপাধি প্রদানের অনুষ্ঠান হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফ্রান্সের প্যারিসে থাকা বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী শাহাবুদ্দিনকে Chevalier de I’Ordre des Arts at des Lettres এ ভূষিত করা হয়েছে। এক অভিনন্দন বার্তায় ফ্রান্সের সংস্কৃতি ও যোগাযোগ বিষয়ক মন্ত্রী অরলি ফিলিপেত্তি বলেন, ফ্রান্সের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে শিল্পী শাহাবুদ্দীন আহমেদের অসামান্য অবদান রয়েছে। শুধু ফ্রান্স নয়, সারাবিশ্বের সংস্কৃতি ও চিত্রশিল্পে তার অনবদ্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এই উপাধি দেয়া হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থায় প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন। তার ক্যানভাসে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, শক্তিমত্তা ও উদ্দাম গতিশীল অগ্রযাত্রা রুপায়িত হয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে দেশে-বিদেশে নিজের শিল্পকর্মের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন তিনি।

শিল্পী শাহাবুদ্দিন ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী হিসেবে প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক লাভ করেন। এছাড়া দেশ-বিদেশে বহুবার পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০০০ সালে লাভ করেন দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। তিনি ১৯৭৪ সাল থেকে প্যারিসে বসবাস করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.