২০০৭ সাল থেকে ক্রমাগত নির্যাতিত হতে থাকা এবং নবম ও দশম সংসদ সময়কালে বাংলাদেশের সর্বাধিক নির্যাতিত নারী একজনই। বয়স্ক ও বিধবা মায়ের জীবনে হঠাৎ এক বজ্রাঘাতের পরও নারী নির্যাতকদের জিহ্বা না সামলানোর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানাই। পিতার কাঁধে সবচেয়ে ভারী পুত্রের লাশ আর বিধবা মায়ের জীবনে শুধু পুত্রের লাশই নয়, সব কিছুই এত বেশি ভারী যে, বহন করার মতো ক্ষমতা কোনোভাবেই থাকার কথা নয়। মা যিনি, ১০ মাস ১০ দিন শুধু গর্ভধারণই নয়, প্রকৃতির এক অবিশ্বাস্য কারুকার্যের মধ্য দিয়ে আরশ কাঁপানো ব্যাথা সহ্য করে ভূমিষ্ঠ করেন নাড়িছেঁড়া ধন।
কিন্তু বৈধ কারণে সেই মা যখন পরিস্থিতি বুঝে অপারগতা প্রকাশ করেন, পরম শত্রুকেও সর্বাধিক মানবিক গুরুত্ব দিয়ে মেনে নিতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে, স্বামীর অবর্তমানে বয়স্ক বিধবা যত কম পেরেশানিতে শোক সামলাতে পারেন। সে জন্য শুধু জিহ্বা সংযত করাই নয়, প্রয়োজনে কেটেও ফেলতে হবে। কিন্তু এ কোন দৃশ্য? বরং কর্মকাণ্ডে মনে হলো, একটাও মায়ের পেট থেকে নয়, সম্ভবত মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েছে। বলতে বাধ্য হচ্ছি, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে যারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান, তথ্য উপদেষ্টা অন্যতম। অন্তত তার কাছ থেকে শোকাতুর খালেদাকে ভদ্রোচিত হওয়া কিংবা শিষ্টাচার শেখার কারণ নেই। যদি মন্দ উপমা দেয়ার মতো মানুষের পুনর্জন্ম হয়ে থাকে, তথ্য উপদেষ্টা অন্যতম। কারণ, সাগর-রুনি আন্দোলন নষ্ট করার মূলে পদ-পদবির লোভ। ধারণা করি, তার কারণেই তদন্তের কবর রচিত হয়েছে এবং দুঃখিনী মায়েরা কেঁদেই চলেছেন। অনুরোধ, এই রকম দিনে অশালীনতা ত্যাগ করে নিজেকে সামলান। পুত্রশোক কী জিনিস, বুঝতে ভুল হলে চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
কোকোর মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনায় আবারো মেকি শোক যন্ত্রণা শিল্পীদের মুখোশ খুলে গেল।
মৃত কিংবা জীবিত, কাকে ছাড় দিলো আওয়ামী লীগ? এটা শিকাগোর জিয়াউর রহমান ওয়ে নয় যে, বানচাল করতে ঢাকা-ওয়াশিংটন তুলকালাম বাধাতে হবে। পুত্রশোক যার হয়, একমাত্র সেই বোঝে, কোন দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে এসব করতে হলো। ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়ানো কেন, যদি অজ্ঞান করার ওষুধও প্রয়োগ করতে হতো, একজন পুত্রশোকী মা হিসেবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, ওই দিন কে লাট সাহেব কে নয়, হিসাব-নিকাশ বৃথা বরং কেউ তার জীবনকে নরক করে ছাড়লে, তার প্রতি তীব্র ঘৃণা দেখানোই স্বাভাবিক। সংসদে এবং বাইরে, জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে এমন কোনো নোংরা শব্দ অভিধানে বাকি নেই, যা ব্যবহার করেনি লীগ।
উদাহরণস্বরূপ সন্ত্রাসের জননী, খুনি, ডাকাতের সরদার, চোর-ডাকাত পুত্র, মোল্লা ওমর, নর্তকী, অঙ্কে ফেল উর্দুতে পাস, সিরিয়ালের নায়িকা, চা বাগানের অজ্ঞাত পুরুষের জন্মা, কোকোর সাথে জিয়াউর রহমানের চেহারায় অমিল, ক্যান্টনমেন্টে কোকোর জন্ম, ওসামা বিন লাদেন… বিশেষণের পর বিশেষণ।
খালেদা জিয়া কেন, যেকোনো মা নষ্টাচারগুলো ঘৃণাভরে মনে রাখবে এবং ঘৃণা করবে। এই রকম দিনে কাদের ওপর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা জন্মায় জানতে চান? যারা এতবার সন্তানের চরিত্র হনন করল, খালেদা জিয়ার ঘুমিয়ে থাকাই স্বাভাবিক বলে মনে করি। লাট সাহেব বা জজ সাহেব, সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা খালেদা জিয়ার। আওয়ামী লীগ বারবারই ভুল করছে, খালেদাকে তারা সর্বাধিক নারী নির্যাতন করেছে। শুধু বাড়ি থেকে বের করে দেয়াই নয়, সন্তানদের সান্নিধ্য থেকেও বঞ্চিত করা, প্রচণ্ড মানসিক চাপে রাখা, রোগবালাইয়ের মুখে ঠেলে দেয়া,
নিজেরা সুখশান্তিতে থেকে অন্যদের সুখশান্তি হারাম করা… কোনটা বাদ? 
সুতরাং লাট সাহেবদের উচিত, আর নারী নির্যাতন না করা, এসব চাপের কারণেই হয়তো কোকোর হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং খালেদার যে অবস্থা দেখছি, তারও হবে না বলা যাবে না। এই মাত্রার নির্যাতন এবং মানসিক চাপ সইবার মতা একজন বয়স্ক বিধবার পে অসম্ভব। উন্নত দেশ হলে আইন কী জিনিস, হাড়ে হাড়ে বুঝতেন শাসকেরা। সচেতন পুরুষদের এহেন মৌনতায় হতবাক। শুধুই কি তাই? গণতন্ত্রকে বালুর ট্রাক, জলকামান, শত শত পুলিশ, হাজার হাজার বুলেট দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। তার কার্যালয় ঘিরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির যুধ্বংদেহী অবস্থা। আর চরিত্র হনন নয়, বরং প্রার্থনা করুন যেন কষ্টগুলো লাঘব হয়। লাট সাহেব আর জজ সাহেব কেউই মৃত্যুঞ্জয়ী নন এবং দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। এলে আমার লেখাটির তাপমাত্রা হয়তো নমনীয় হতো।
৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে, কোনো মুসলমানের মৃত্যু হওয়ার সংবাদ প্রচারের সাথে ‘ইন্না লিল্লাহি’ বলার নিয়ম, কিন্তু এখানেও ব্যত্যয়? মৃত কোকো নয়, সংবাদের প্রধান খোরাক, খালেদা কি সত্যিই ঘুমের ইনজেকশন নিয়ে ঘুমিয়েছিলেন, নাকি ইচ্ছে করে দেখা করেননি? অনলাইন, টেলিভিশন, সোস্যাল মিডিয়া সর্বত্রই প্রাধান্য পেল একজনের ফিরে যাওয়ার খবর।
সংবাদকর্মী নয়, যেন একগাদা এতিম বা বেকারকে এনে টেলিভিশনে কর্মসংস্থান করেই খালাস। সংবাদমাধ্যমে মৃতের প্রতি এহেন অসম্মান এবং নারী নির্যাতনের সর্বশেষ নমুনা রাজনীতি ও মিডিয়ার জন্য নারকীয় দৃষ্টান্ত। সংবাদকর্মীদের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, ভুলে গেছে, এটা কোকোর গায়ে হলুদ নয়। যত মন্দ বা ভালো হোক, দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে নাড়িছেঁড়া ধন। শুধু তাই নয়, লাট সাহেবদের কারণে বহু বছর ধরে মা এবং পুত্রদ্বয়ের প্রচণ্ড মানসিক চাপে জীবন লণ্ডভণ্ড।
কার সম্মানে গেট খুলবে? এই গেট বন্ধ হয়েছিল কার নির্দেশে?

