[author ]হোসাইন আব্দুল হাই, বন, জার্মানী।[/author]
শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। শিক্ষার মধ্য দিয়েই মানুষের মাঝে সূচিত হয় মানবতার মহান আদর্শ। তবে শিক্ষা মানুষকে কতটা মানবিক কিংবা মহান করে তুলতে পারে তা নির্ভর করে শিক্ষার গুণগত মানের উপর। সেই জায়গাতেই মূলত উন্নয়নশীল এবং উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে প্রধান ব্যবধান লক্ষণীয়। সেক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীর নিজস্ব মেধা, ঝোঁক কিংবা আগ্রহের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার উপরেও শিক্ষার্থীদের মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই বিশ্বায়নের ছোঁয়ায় তথ্যের অবাধ বিচরণের ফলে বর্তমানে সামর্থবান পিতামাতা এবং ছেলেমেয়েরাও উন্নত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগাতে অধিকহারে আগ্রহী হচ্ছে।
অবশ্য উন্নত দেশের উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার সুযোগ লাভের চেষ্টা করতে গিয়ে কিছু শিক্ষার্থী মাঝপথেই হোঁচট খেতে পারে। আবার কেউ কেউ উন্নত দেশের নতুন সমাজব্যবস্থা এবং নতুন সংস্কৃতির দোলায় অবগাহন করে খেই হারিয়ে ফেলে। তাই কোন একটি উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, অবস্থান, সেখানে কোন কোন বিষয় পড়ানো হয়, ভর্তির শর্তাবলী কী, কীভাবে সেখানে সহজে লেখাপড়ার সুযোগ পাওয়া যায় – শুধুমাত্র এসব তথ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট নয় – বরং তাদের সামনে নিজের দেশের সাথে উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্য এবং সেই ভিন্ন পরিবেশে এবং পরিস্থিতির মধ্যে নিজের মেধার যথার্থ বিকাশ, নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার সঠিক বহিপ্রকাশ ঘটাতে সহায়ক বিশ্লেষণ তুলে ধরার প্রচেষ্টা থেকেই এই ধারাবাহিক লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে এবং অভিভাবকদের মাঝে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার বিষয়ে একটি তথ্য খুব বেশি পরিমাণে বিচরণ করে – তা হল জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য বেতন-ভাতা লাগে না কিংবা খুব সামান্য পরিমাণ। ফলে অনেকেই মনে করেন – জার্মানিতে লেখাপড়া করতে গেলে হয়তো খুব কম খরচেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হবে। এমন ধারণা থেকে অনেকেই অন্যান্য পরিপ্রেক্ষিতগুলো বিবেচনা না করেই জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু ভর্তি প্রক্রিয়া শুরুর পর বেশ কিছু পথ পাড়ি দেওয়ার পর হয়তো জার্মানিতে বিদেশিদের লেখাপড়ার খরচ সম্পর্কে প্রকৃত হিসাব জেনে অনেকে বিচলিত হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে তথ্য ঘাটতি কিংবা তথ্যের আংশিক বিকৃতির পেছনে থাকে এক শ্রেণীর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যারা কিছু তথ্য চেপে রেখেই শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টিকে অতিরিক্ত সহজতর করে উপস্থাপন করে তাদের ব্যবসায়িক সাফল্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যখন জার্মানিতে এসে মোটা অঙ্কের খরচ কিংবা অর্থনৈতিক শর্তাবলীর চাপে পিষ্ট হতে থাকেন, তখন তাদের সহায়তার জন্য কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দেখা মেলে না। এমন পরিস্থিতিতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে অবশ্য এখন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে পুরোন কিংবা বলা যেতে পারে সাবেক শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা বেশ কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। সেগুলোতে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আগ্রহীদের জন্য যেমন নানা তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, তেমনি সবজান্তা গুগল এর শরণাপন্ন হলেও ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় অগাধ তথ্য মিলবে উচ্চশিক্ষার বিষয়ে।
তবে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রচেষ্টা শুরুর আগেই যেটি খুব ভালো করে মনে রাখা দরকার এবং সতর্ক হওয়া জরুরি তা হল জার্মানি কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মত কোন ইংরেজি ভাষার দেশ নয়। ফলে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যারা প্রথম শ্রেণী থেকেই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শেখে এবং বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণীতে ইংরেজি বিষয়ের উপর নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্লাসে হাজির হয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তবেই না উপরের শ্রেণীতে ওঠে তাদের জন্য একটি নতুন ভাষার দেশে উচ্চশিক্ষা যে ঠিক ততটা সহজ হয় না তা আগে থেকেই মনে রাখতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ইংরেজির প্রচলন ও প্রভাব এতোটাই ব্যাপক যে, সেখানে বসে যে কেউ ভাবতে পারেন সারা দুনিয়ার শিক্ষিত এবং উন্নত মানুষগুলি বুঝি শুধু ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন। অন্তত বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরের কেউ মানে কোন বিদেশি ইংরেজি ভাষায় অনর্গল কথার ফুলঝুরি ঝরাতে পারবেন না এমনটি যেন আমরা ভাবতেই পারি না। আর সেই ভাবনা থেকে আমরা জার্মান, ফ্রেঞ্চ কিংবা স্প্যানিশদের মাঝেও ইংরেজির ব্যাপক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা আশা করে থাকি। কিন্তু এসব দেশের মানুষ যে, ইংরেজি শেখা কিংবা না শেখাটাকে কোনভাবেই যোগ্যতা কিংবা দক্ষতার মাপকাঠি মনে করেন না তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। বরং এসব দেশের মানুষ নিজেদের ভাষায় কথা বলা, কাজ করা এবং নিজেদের ভাষার ব্যাপক প্রসারণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি ইংরেজি ভাষাতেও কেউ স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে লেখাপড়া করতে চাইলেও তাকে জার্মান ভাষার উপর এতোটাই ভালোমানের দক্ষতা রাখতে হবে যাতে করে জার্মান ভাষাতেই যে কোন গবেষণা করতে সক্ষম হয়। এই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে এদের নির্ধারিত সি – ওয়ান ধাপ উত্তীর্ণ হতে হয়। বাংলাদেশের কোন কোন শিক্ষার্থী মনে করেন, লেখাপড়ার মাধ্যম যদি কোথাও ইংরেজি ভাষায় হয়, তাহলে হয়তো জার্মান ভাষা না জানলেও চলবে। কিন্তু জার্মানরা কিছু বিষয়ে শুধু ইংরেজি ভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ রাখলেও, তাদের সমাজ কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ঠিক এমন ধাঁচে তৈরি করে রেখেছে যে, জার্মান ভাষা না জানলে ওষুধ-পত্র ও খাবার-দাবার থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও কেনাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে।
আর বাংলাদেশ থেকে বৃত্তি ছাড়াই কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি আসলে তো আরও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয় জার্মান ছাড়া কোন কাজ না পাওয়ায়। যারা মনে করেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছু কাজ করে হয়তো নিজের খরচের অর্থ জোগাড় করা যাবে, তারাই সবচেয়ে হতাশ হয়ে একূল-অকুলের অনেক কিছুই হারান। কারণ জার্মান ভাষা না জানলে কোন উদ্যোক্তাই কাজ দিতে চান না, আর তবুও যদি কাজ জোটে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রেস্তোরাঁয় সহায়ক হিসেবে। এমন ক্ষেত্রেও বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করে হীনমন্যতা, কারণ বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের কারণে এমন কাজ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন তারা, অথচ ঠিক তাদের সাথেই দেখা যাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জার্মান ছাত্র-ছাত্রীরাও একই রেস্তোরাঁয় কাজ করেন কোন ধরণের জড়তা ছাড়াই।
এছাড়াও জার্মান ভাষা শেখার জন্য বহু মাস পার করার পরেও অনেকে শেষ পর্যন্ত বারবার ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে আবার দেশে ফিরে যান। সেক্ষেত্রে মাঝে থেকে শুধু হারিয়ে যায় তরুণ বয়সের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সময়। তাই ভাষাগত এমন হুমকির কথা ভেবে বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আসবে না – সেজন্য আলোচনার অবতার নয়, বরং ভাষাগত এমন হুমকিকে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানির মত উন্নত দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালে পা পিছলে গভীর খাদে পড়ার আশঙ্কা থাকবে না। আর জার্মান ভাষায় যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের জন্য ঢাকায় আরও অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত সঠিক তথ্য-উপাত্ত পেতে এবং জার্মান ভাষায় যথাযথ দখল অর্জন করতে গ্যোটে ইন্সটিটিউটের বিকল্প নেই বলেই মনে করেন অধিকাংশ জার্মান প্রবাসী শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবীরা।
(চলবে)
লেখকঃ জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক।

