২১ বছরের প্রবাস জীবনের ব্যর্থ গল্প

[author ]রাসেল খান[/author]

bangla_22

সিঙ্গাপুর। তখন রাত সাড়ে ১১ টা বাজে। আমি বাড়িতে ফোন করছিলাম, এমন সময় দেখলাম পাশে একজন লোক অনেক ক্ষণ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে ভাবলাম লোকটার কি হয়েছে এভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষন পর আবার তাকালাম, লোকটা আগের মতই আছে। টেলিফোনের লাইনটা কেটে লোকটার কাছে গেলাম।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম- দেশী ভাই নাকি?
– হ্যা।
-ভাই অনেক ক্ষন ধরে দেখলাম আপনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন!
-এইতো ভাই হিসাব করছিলাম এই প্রবাসে জীবনে কি পেলাম আর কি হারালাম আর ২১ বছর প্রবাস জীবনে দুঃখগুলো ভাবছিলাম।
আমি ২১ বছরে কথা শুনে খুব কৌতুহলী হয়ে বললাম ভাই আমাকে বলবেন আপনের দুঃখ গুলো আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
লোকটি – ভাই ২১ বছরে দুঃখগুলো মাত্র কয়েক মিনিটে শুনে কি করবেন?
– ভাই আমি হয়ত পারবনা আপনার দুঃখগুলো তাড়িয়ে দিতে, কিন্ত হতে পারে যে আপনের দুঃখগুলো থেকে কিছু শিখতে পারি কারণ আমি ও তো একজন প্রবাসী।

তিনি বলতে শুরু করলেন – “তাহলে শুনেন, আমরা ছিলাম ৬ ভাইবোন, আমি ছিলাম সবার বড়। বাবা ছিলেন কৃষক। নিজেগো জমি চাষ করতাম বাবার সাথে। বাপ বেটা মিলে সংসারে অভাব দূর করতে পারতাম না। ছোট ভাইবোনদের পড়ালেখা করত ওদের কাউকে ক্ষেত খামারে নিতাম না যদি পড়ালেখার ক্ষতি হয়। এভাবে দিনের পর দিন কষ্ট করতে লাগলাম কিন্তূ কষ্টের দিন শেষ হয় না। একদিন কিছু জায়গা বিক্রি করে পাড়ি দিলাম ইরাক। সেখানে চার বছর ছিলাম তারপর বাড়িতে আসলাম। এর মাঝে সংসারে অভাব কিছুটা দূর হলো ভাইবোনদের পড়ালেখা ভালো চলছিল। কিছুদিন যাবার পর দেখালাম আবার ও পরানো দুঃখটা বাড়ির চারপাশে ঘুরতাছে। আবার পাড়ি দিলাম সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুর এসে মাত্র কয়েক মাস থাকার পর পারমিট বাতিল করে দিল। দেশে গিয়ে পড়লাম মহাবিপদে, যা টাকা ছিল সব শেষ। মা বাবা বললেন বিয়ে করতে ,আমি বিয়ে করিনি কারণ ভাইবোন গুলো পড়ালেখা শেষ করে চাকরি পাক; আবার বোনদের বিয়ে দেওয়া হয় নাই ভেবে। কয়েক বছর পর আবার আসলাম সিঙ্গাপুর। এর মাঝে কেটে গেল অনেক বছর। ছুটিতে বাড়ি গেলাম বিয়ে করব বলে কিন্ত বিয়ে করতে গিয়ে পড়লাম অনেক ঝামেলায়। বয়স বেশি আর অশিক্ষিত বলে ভাল বাড়িতে বিয়ে করতে পারলাম না। শেষ কোনো উপায় না পেয়ে গরিবের এক মেয়েকে বিয়ে করলাম তা আবার আমার থেকে অর্ধেক বয়সের। জীবনে খুঁজে পেলাম সুখের ঠিকানা। ভালো কাটছিল, ছুটির দিনগুলোতে মনে হত পৃথিবীতে আমি একজন সুখী মানুষ। ছুটি শেষ করে আবার চলে আসলাম সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুর এসে কোনো কিছু ভালো লাগত না। রাতে ঘুম আসেনা কাজে মন বসে না। বাড়ি যাওয়ার জন্য মন ছটফট করত। মনে মনে ভাবলাম ভাইবোনদের বিয়ে হইছে, ভালো চাকরি হইছে। আমার দায়িত্ব শেষ এই ভেবে একেবারে বাড়ি চলে গেলাম। এটাই ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল এখন সেই ভুলের মাসুল দিতেছি। কিছু দিন যাওয়ার পর দেখালাম চেনা মানুষ গুলো অচেনা হয়ে গেল। যে মা বাবা ভাই বোনদের জন্য এত কষ্ট করলাম তারা যেন আমাকে চিনে না কারণ আমি কেন একেবারে চলে এলাম দেশে। বুঝতে পারলাম এতদিন ওরা আমাকে ভালোবাসেনি, ভালবাসত আমার টাকাকে।

শেষ পর্যন্ত এগুলা নিয়ে বউয়ের সাথে লাগলো ঝামেলা। মাঝে মাঝে এত কষ্ট লাগে যাদের জন্য এত কষ্ট করলাম আজ তারা কত সুখে আর আমি একাই কত কষ্ঠে আছি। আজ ভাগ্যের কঠিন আঘাতে ভেঙ্গে চুরমার হয়েগেছে আমার মন দেহ। ভ্যাগের কঠিন নিয়মে পরাজিত হয়ে দিক-বেদিক হারিয়ে গেছি।
অভাবের দিন যে কত বড় তা শুধু অভাবে যারা থাকে তারা বুঝে। আবার টাকা ঋণ করে সিঙ্গাপুর আসলাম। ঋণের তাড়নায় কোনো কিছু ভালো লাগে না। একদিন ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম। বললাম আমাকে এক লাখ টাকা ধার দেও। সে যে কথা বলছে আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে করত মরে যাই কিন্ত আমার ছেলেতির কথা মনে পড়ে যায়। মা বাবা ভাই বোন সবাই সুখে আছে হয়ত বউ চলে যাবে কিন্ত আমার ছেলের কি হবে, হয়তবা ভাইদের অনাদর অবহেলায় বড় হবে। এসব ভেবে আবার নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলাম শেষ বয়সে।” -কথাগুলো বলতে বলতে দেশী ভাইটি কাঁদছিলেন আমি ও তার কথা শুনতে শুনতে কখন যে কাঁদতে ছিলাম আমি নিজেও বুঝতে পারি নি। দেশী ভাই কে কি বলে সান্তনা দেব আমার সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
শুধু বললাম, আমরা প্রবাসীরা হলাম এমন এক যুদ্ধের সৈনিক, যে যুদ্ধ জয়ের উল্লাস আমরা করতে পারি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.