রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী
১৯৮৮ সালের দিকে আমরা লন্ডনে চলে আসার সিদ্বান্ত নেই। আত্মীয় স্বজনদের এডভাইস তোমাদের বাবাকে বলো লন্ডনে নিয়ে যেতে। বাবা আমাদেরকে লন্ডনে নিয়ে আসতে নারাজ। বাবার যুক্তি হচ্ছে একবার দেশ ছাড়লে আর দেশে আসা হবেনা। তোমরা প্রবাসী হয়ে যাবে। বাবা চান আমরা দেশেই প্রতিষ্টিত হই। আমার বাবা দেশকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। বাবার ধারনা দেশ এবং দেশের মানুষ ধোয়া তুলসী পাতা! আমি বাবাকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন সময় বোঝানোর চেষ্টা করেছি বাবা যে বাংলাদেশ আপনি দেখেছেন এবং বাংলাদেশের মানুষ দেখেছেন সে মানুষগুলোর স্থান হয়েছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে। বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষ নৈতিক চরিত্র অনেক আগেই নষ্ট করে ফেলেছে। কিন্তু বাবা আমার কোনো কথাই শুনতে রাজি না। বাবার ধারনা আমি বেশী কথা বলি। এবং দেশকে নিয়ে আজে বাজে কথা বলি। আমি যে দেশকে নিয়ে আজেবাজে বলিনা এটাও তিনি বিশ্বাস করেননা। বাবা ভাবতেন এক ধরনের হতাশা আমার মধ্যে কাজ করছে। বাবা আমাকে বুঝাতেন, যে, দেশের ব্যাপারে আজেবাজে কথা বলে সে কখনো দেশপ্রেমিক হতে পারেনা। দেশ যে বঙ্গবন্ধু পরিবারের, জিায়াউর রহমান সাহেবের পরিবারের আওয়ামী এবং বিএনপি পরিবারের এ কথা বাবাকে কে বুঝাবে? বাবা আমাকে বলতেন রাতের পর যেমন দিন আসে, একটি দেশের বেলায় ও তাই, দেশ এক সময় উঠে দাড়াবে। এমন থাকবেনা। দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু ততক্ষনে আমি বা আমরা যে আজীমপুর কবরস্থানে জায়গা করে নিব সেটি আমার দেশ প্রেমিক বাবাকে কোনো ভাবেই বুঝাতে পারিনা। কি আর করা। হাল ছেড়ে বসে আছি। একদিন বাবাকে চিটি লিখলাম ১০ পৃষ্টার চিটি।
দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, আগামী ১০ বছরে দেশ কোথায় গিয়ে দাড়াবে, নেতা নেত্রীরা কি করবে, গরীব মানুষের কি হবে বিস্তারীত বর্ণনা করে চিঠি লিখলাম, বাবা চিটি পেয়ে উত্তর না দিয়েই আমাদের লন্ডন আসার কাগজপত্র ঢাকায় বৃটিশ হাইকমিশনে জমা দেয়ার জন্য বাবার বন্ধু ব্যারিষ্টার আলতাফুর রহমান সাহেবকে বললেন। আলাতাফুর রহমান বাবা যে লন্ডনে বসবাস করেন তা তিনি জানতেননা। সে অনেক কথা। ১৯৮৮ সালের শেষের দিকে কাগজ পত্র জমা দেয়ার পর পুরো দেড় বছর সময় লেগে যায়, ১৯৯০ সালের দিকে আমরা এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্স নিয়ে মে মাসেই লন্ডনের হিথ্রো এয়ারপোর্ট এ এসে পৌছেছিলাম, জন্মদাতা পিতা আমাদের ৪ ভাই এক বোন সহ মাকে রিসিভ করেছিলেন। সেই থেকে লন্ডনের পথ চলা। ঘুমের পর অনেক পথ চলার আছে বাকী। আমি পথ চলতে থাকলাম। প্রথম প্রথম লন্ডনকে আমার আপন মনে হতোনা। যে দেশকে দেশের মানুষকে এক সময় আমার মনে হতো যন্ত্রনা, সেই দেশকেই আমি প্রচন্ডভাবে মিস করতাম। মিস করতাম আমার প্রচন্ড ভালোবাসার মানুষটিকে, কত অনুনয় কত আকুতি তোমি চলে এসো দেশে, আমি তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি তোমি আমার হাজার বছরের স্বপ্ন। মিলিয়ন ডলারের নিঃশ্বাস তুমি আসবেনা জেনেও সিলেটের এয়ারপোর্টের দিকে অপলক দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকি। প্লেইন দেখলেও আকাশের দিকে চেয়ে থাকি ইত্যাদি। অসংখ্য চিঠি ভালোবাসার চিঠি আমি রিসিভ করতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি যে লন্ডনের প্রেমে পড়ে গেছি সেটি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে বুঝাতে পারিনা। আমি গভীর মমতায় জড়িয়ে গেছি লন্ডনে। লন্ডনকে আমার ভীষন ভালো লাগে।
টেমসের নীরে অনেক শান্তী। তখনো পূর্ব লন্ডনের ডকল্যন্ড ক্যনারারীওয়ার্ফ এর কাজ শেষ হয়নি। আমি বসে থাকতাম টেমসের পাড়ে। টাওয়ারব্রিজের পাশ ধরে আমি হাটতাম।লাইম হাউস ব্রিজ হয়ে টেমস পাথ ক্রস করে ক্যানারীওয়ার্ফের নীচে বসে থাকতে আমার অনেক ভালো লাগতো। ওয়েষ্টফেরী সার্কাস থেকে ইনজিন চালিত নৌকা করে সাউথ ব্যংক ,অথবা ওয়েষ্টমিনিষ্টার ব্রীজে এসে বিকেলের পড়ন্ত গোধুলী আমি উপভোগ করতাম। লন্ডন শহরের চাক চিক্য কেন জানি আমাকে ভীষনভাবে হাতচানি দিয়ে ডাকতো। জীবনের ২৭ টি বছর আমি কাঠিয়েছি এই লন্ডন শহরে। কত কথা, কত স্বপ্ন, কত রাগ কত অভিমান, সব কিছুই তো আমি মেনে নিয়েছিলাম এই লন্ডন শহরটার জন্য।লন্ডনের এই চাক চিক্যের কারনে আমি এক সময় ভুলে গিয়েছিলাম কোকিলের কুহু কুহু ডাক, সারাক্ষন ডাকে কোকিল। সবুজ ধান গাছ, গ্রামের মেটোপথ, কৃষকের লাঙ্গল, শীতের দিনে খেজুরের রস,জোছনা রাতে পাগল হওয়া বাশীর সুর সবই তো স্মৃতি হয়ে আমাকে এখন তাড়া করে বেড়ায়। গত এক দেড়মাসের ঘটনা লন্ডন শহরেকে ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলেছে। যে লন্ডন শহরে বসে ঢাকার বাংলা ভাইয়ের গল্প শুনতাম, একই দিনে ৬৪ টি জেলায় বোমা বিস্ফোরনের খবর শুনতাম, একুশে আগষ্ট এর গ্রেনেড হামলার খবর শুনতাম, কিবরিয়া সাহেবকে বোমা মেরে, মেরে ফেলার খবর শুনতাম, বিডআর পিলখানায় ৬০ জন সেনা অফিসার হত্যার সংবাদ শুনতাম, সেখানেই এখন লন্ডনে লন্ডন ব্রীজে হামলার খবর শুনি, ছুরি হাতে দুর্বত্তদের আক্রমনের কথা শুনি, মানচেষ্টার ট্রাজেডির কথা শুনি, গ্রেনফেল্ড টাওয়ারে আগুনের কারনে মানুষ মরার সংবাদ শুনি, নর্থ লন্ডনের ফেইন্সবাড়ী পার্কের মসজিদের মুসল্লীদের উপর গাড়ী তুলে একজন বৃটিশ বাংলাদেশীকে হত্যার খবর শুনি, আমাকে শুনতে হয়।
যে বৃটেন কে এক সময় মনে হতো সেইফ বৃটেন সেইফ লন্ডন, শান্তীর শহর লন্ডন সেই লন্ডন এখন ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। লন্ডন মেয়র সাদিক খানের কথা শুনে আমেরিকা থেকে ট্রাম্প সাহেব বলে উঠেন সেইফ লন্ডনে এক সপ্তাহের মাথায় তিনবার হামলা হয়। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে যতই বলুন শান্তীর কথা, সহমর্মীতার কথা কিন্তু কে শুনে কার কথা। যতই সমাজতান্ত্রীক মুল্যবোধের কথা জেরেমী করবীন বলুননা না কেন তাতে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয়না। এবারের নির্বাচনের আগে এবং এখন পর্যন্ত অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে জেরেমি করবীনের। তিনি ছাত্রদের টিউশিন ফি বাতিল করার ঘোষনা দিয়ে লাইম লাইটে এসেছেন। যুবকরা তার কথা শুনে মন্ত্র মুগে¦র মত। জেরেমী করবিনের মিছিলে অনেকেই সামিল হয়েছেন। সামিল হয়েছিলেন টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন, পিঠার ম্যান্ডেলসন আর রবিন কুকের মিছিলেও। টনি ব্লেয়ায় ক্ষমতায় আসার পর পরই রবিন কুকু ফরেন সেক্রেটারী হয়েছিলেন হয়ে বলেছিলেন আজ থেকে এথিকেল ফরেন পলিসি চালু হলো! বলার একমাসের মাথায় তিনি জিম্বাবুয়েতে আর্মস বিক্রি করেছিলেন।
জেরেমী করবীনের বক্তেব্যে অনেক কিছুই থাকে। মুক্তির কথা থাকে।সমাজতন্ত্রের কথা থাকে। গ্লোষ্টনবাড়ীর মিউজিক ফ্যাস্টিব্যালে দাড়িয়ে যে বক্তব্য তিনি রেখেছেন সেটি ছিল আগুনজরা বক্তব্য। তার বক্তব্যে আশা থাকলেও ভরসা পাইনা আমি। জেরেমী বলছেন তিনি আগামী ৬ মাসের মধ্যে ক্ষমতায় যাবেন। যদি তিনি চলেও যান তাহলে কি হবে? বৃটেনের অবস্থা কি গ্রীস ইটালীর মতো হবে? কে জানে! স্বপ্নের পথ চলা যেন থমকে গেছে লন্ডনের সাম্প্রতকি ঘটনাবলী। লন্ডন শহর পৃথিবীর মধ্যে শান্তিরশহর ছিল এটি এখন অনেকটা রুপ কথার গল্পের মতোই শুনাতে পারে।
১৯৯০ সালে লন্ডন এসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখেছিলাম মার্গারেট থেচারকে, তারপর দেখেছি তারাকা কথিত প্রধানমন্ত্রীদের। জন মেজর, টনি ব্লেয়ার, গর্ডন ব্রাউন, সর্বশেষ দেখেছি ডেভিড ক্যমরুন সাহেবকে, কিন্তু কোথায় এসব তো হয়নি, ঘটেনি, চলার দীর্ঘ পথ পরিক্রমা আজকের দিনে হয়তো অতীতের বিবরন রুপ কথার গল্পের মতোই শুনাবে। কিন্তু বাস্তবতা কি, আমরা শান্তীতে ছিলাম, এসব ইতিহাস অনেকেই জানেনা, জেনেই বা কি লাভ? কত স্বপ্নই তো মানুষের ছিন্ন বিন্ন হয়ে যায়, কত নস্ট রাজনিতি পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলে. কত রাজনীতি পথ হারায়, সাদ্দাম হোসেন, ওসমা বিন লাদেন, টনি ব্লেয়ার বুশ সাহেবদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত পাপের রাজনীতি কি আমাদের এ অশান্ত পৃথিবীর জন্য দায়ী? কে জানে।
আমি জানিনা, যে দেশ ছেড়ে আমি লন্ডনে আশ্রয় নিয়েছিলাম, এখন কি আমি এই লন্ডন ছেড়ে আবার বাংলাদেশে আশ্রয় নিব আমি জানিনা, আমি আর ভাবতে পারিনা। সব কিছু কেমন যেন ঝাপসা লাগে।
পাদটিকা= সম্প্রতি থেরেসা মে ডি ইউপি সাথে লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন, আমরা জানিনা এ কোয়ালিশনের সরকার কতদিন চলবে? এ সরকার কি পারবে দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধ করতে? বাংলাদেশ থেকে যখন গনমাধ্যম ব্যাক্তিত্ব শাইখ সিরাজ সাহেব জিজ্ঞাস করেন কি খবর ফয়সল এ কি অবস্থা বৃটেনের, তোমরা তো আগে আমাদরেকে অনেক কথা শুনিয়ে দিতে এখন কি বলবে লন্ডনের এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের তখন কিছুই বলতে পারিনা সিরাজ ভাইকে। জবাব নেই।
লেখক, সভাপতি ইউকে বাংলা প্রেস ক্লাব
ব্যবস্থাপনা পরিচালক চ্যানেল আই ইউরোপ
