
ইকবাল করিম নিশান: মৌলবাদ বনাম পদ্মাবতী। আপাতত কট্টর হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদের আঘাতে নাকাল পদ্মাবতী। পদ্মাবতীর পক্ষেও আছে একটা পক্ষ। বড় পক্ষ। যারা মৌলবাদকে ঘৃণা করেন, তারা পদ্মাবতীর পক্ষ নেবেন এটা স্বাভাবিক। হচ্ছেও তাই। শেষ পর্যন্ত পদ্মাবতীর জয় হবে-এটাই নেচার। দিনের আলোতে যদি কেউ চোখ ঢেকে বলে এখন রাত, বা জ্যোৎস্না রাতে চোখ বন্ধ করে অমাবশ্যা বলে, বলতে পারে-তা তার কাছেই। নেচার বলবে ভিন্ন কথা, সত্যতা। দিন আর জ্যোৎস্না দেখবে যারা আমি তাদের দলে। তাই আমার অবস্থান পদ্মাবতীর পক্ষে। আর এটাই স্বাভাবিক।
বলছিলাম, সঞ্জয়লীলা বানসালির পদ্মাবতী ছবি প্রসঙ্গে। ভারতজুড়ে এটি এখন মৌলবাদী রাজনীতির শিকার। সরাসরি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে এটি এখন বিগ ইস্যু। রাজ্যে রাজ্যে চলছে ছবিটির মুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। কারণ, হিন্দু রানীর সাথে মুসলিম সম্রাটের প্রেম। হিন্দু মৌলবাদীরা বাদ সেধেছে এ নিয়ে। যদিও পদ্মাবতী নিয়ে বিতর্কের শুরুটা হয় রানী পদ্মাবতীর একটি নাচ আর সম্রাটের সাথে রানীর ঘনিষ্ঠ একটি দৃশ্য নিয়ে। যদিও পরিচালক বারবার বলছেন, দ্বিতীয় দৃশ্যটি ছবিতে নেই। কে শুনে কার কথা। প্রতিবাদ থামছেই না। নিত্যনতুন মোড় নিচ্ছে বিক্ষোভের নাটক। রাষ্ট্রও সায় দিচ্ছে প্রকাশ্যে। গুজরাট, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে পদ্মাবতীর মুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজ্য সরকারগুলো। তবে ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাগত জানিয়েছেন পদ্মাবতীকে। শুধু স্বাগত নয়, বলেছেন ছবিটির প্রিমিয়ার হোক কলকাতায়। স্যালুট মমতাকে।
একটু পেছনে ফিরি। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের উজ্জ্ব্ল নিদর্শন কবি আলাওলের অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ পদ্মাবতী। কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবৎ কবিতার অনুবাদ এটি। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে জায়সী কবিতাটি লেখেন। এর প্রায় ১০০ বছর পর আরাকানের বৌদ্ধ রাজা অমাত্য মাগন ঠাকুরের নির্দেশে আলাওল পদ্মাবতী রচনা করেন। এই কবিতার কাহিনিতে ঐতিহাসিকতা কতটুকু তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। এক দল মনে করে, বাস্তবেই রানী পদ্মিনী ছিলেন। রানীকে বাস্তব চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে পদ্মিনী চরিত্র একটা বিরাট রহস্য। তবে জায়সী ও আলাওল দুজনই কবিচিত্তে প্রভাবিতএ নিয়ে বিতর্ক নেই। মধ্যযুগে ধর্মীয় সাহিত্য যখন প্রভাব বিস্তার করেছিল, সে সময় পদ্মাবতী ছিল স্বতন্ত্র অনুপম শিল্পকর্ম। পদ্মাবতী কবি আলাওলের শ্রেষ্ঠ কাজ বলে পি তরা গণ্য করেন। রাজকন্যা পদ্মাবতী, চিতোরের রাজা রতসেন, দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি এবং রাজা দেবলাল এই চরিত্রগুলো নিয়ে কাল্পনিক কাহিনির কাব্যরূপ পদ্মাবতী। এই হলো সংক্ষেপে পদ্মাবতীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। আর বানসালির পদ্মাবতী দীপিকা পাড়–কোন, আলাউদ্দিন খিলজি রণবীর সিং এবং রাজা দেবলাল শহীদ কাপুর।
পদ্মাবতীর ভাগ্যে কী আছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রযোজক ১৯০ কোটি টাকা লগ্নি করেছেন এই ছবিতে। যদিও বীমা করা আছে ১৪০ কোটির। ভারতীয় সেন্সর বোর্ড এখনও ছাড়পত্র দেয়নি ছবিটিকে। পদ্ধতিগত ত্রটির কারণ দেখিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ বোর্ড অব ফিল্ম ক্লাসিফিকেশন ছবিটি আনকাট ছাড়পত্র দিয়েছে। ইতিহাস বিকৃতি বা সাম্প্রদায়িক অনুভূতিতে আঘাত লাগা কোনো প্রশ্ন তারা আনেনি। তবু এতে খুশি নন বানসালি। তিনি চান দেশে আগে ছবিটি মুক্তি দিতে। এ জন্য ১ ডিসেম্বর থেকে সরে আগামী বছরের জানুয়ারিতে মুক্তির সময় পিছিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে, পদ্মাবতীর পক্ষে রাস্তায় নেমেছে বলিউড। গত রোববার ১৫ মিনিটের জন্য বাক আউট করেছে ইন্ডিয়ান ফিল্মস অ্যান্ড টিভি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন (আইএফটিডিএ)। প্রতিবাদে জোট বেঁধেছে ২০টি সংগঠন। তারা বলছে, সৃষ্টিশীল মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য এই প্রতিবাদ। যখন কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজস্থানের করণি সেনার মতো সংগঠনগুলো বানসালি ও দীপিকার মাথার দাম বিশ কোটি ধার্য করেছে, তখন প্রগতিবাদ থেমে থাকতে পাওে না। যখন হরিয়ানা রাজ্যের বিজেপি নেতা সুরুজপাল মমতাকে রাবণের বোন সুপর্ণখার সাথে তুলনা করে হুমকি দিয়ে বলেন, সুপর্ণখার মতো নাক কেটে দেওয়া হবে, তখন পদ্মাবতী ছাড়িয়ে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। নড়েচড়ে বসেছে সুশীল সমাজও। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের সংস্কৃতি এটা নয়। এটা ওদেরই সংস্কৃতি।
যারা মনে করেন হিন্দুস্তানের সম্মান একমাত্র বিজেপির হাতে সুরক্ষিত, তারা পদ্মাবতী নিয়ে অপরাজনীতি করছেন নিজেদের স্বার্থে। দেশের সংস্কৃতি রসাতলে যাক, তাতে তাদের কী। ভোটের রাজনীতিতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলেই তো হলো। রাজনৈতিক কেল্লা ফতে। পদ্মাবতী এখন রাজনীতির মসলায় পুরো মাখামাখি। লাশ দরকারতাও পেয়ে গেছে। রাজস্থানের জয়পুরের নাহারগড় দুর্গের বুরুজ থেকে উদ্ধার হয়েছে এক যুবকের লাশ। ২৩ বছর বয়সী এই যুবকের নাম চেতন সাইনি। পেশায় সোনা ব্যবসায়ী। পাশে পাথরে লেখা, আমরা শুধু কুশপুতুল টানাই না, এটা পদ্মাবতীর বিরোধিতা। এই মৃত্যু নিয়ে ভিন্ন কথাও তুলেছেন অনেকে। সন্দেহ করা হচ্ছে, অন্য কোনো ঘটনা পদ্মাবতীর নামে চালিয়ে দেওয়া। এও তো একটা রাজনীতি। সুতরাং এই খেলা কোথায় থেকে কোথায় গড়ায় আর কোথায় যে শেষ, তা এর নায়করাই বলতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে পদ্মাবতী কেবল উপলক্ষ হলেও হতে পারে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে এই পদ্মাবতী। দিল্লি গিয়ে করণি সেনাপ্রধান লোকেন্দ্র সিং কালভি নালিশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। বলেছেন, গোটা দেশে পদ্মাবতী নিষিদ্ধ করা হোক। এই ধরনের ছবি লাভ জিহাদকে উৎসাহিত করবে এমন হাস্যকর যুক্তি ক্ষমতাসীন বিজেপি, বজরঙ্গ দল ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের স্বঘোষিত সমাজপতিদের। সুতরাং পদ্মাবতীর ভাগ্যে কী আছে, তা বলা যাচ্ছে না এখনও। কারণ এই পদ্মাবতী পুরোপুরি রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। মৌলবাদের মোড়কে ভোট ভিক্ষার হাতিয়ার এখন পদ্মাবতী। তবুও আমরা আশাবাদী, মৌলবাদের কাছে সংস্কৃতি পরাজিত হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত পদ্মাবতীর জয় হবে। জয় হবে প্রকৃতির। জয় সত্যের।
লেখক : প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই), জিটিভি।
iknissan@gmail.com
