মডেল সাবিরার আত্মহত্যা: যা শেয়ার করতে মানা

[author image=”https://scontent-hkg3-1.xx.fbcdn.net/v/t1.0-1/c0.1.735.735/10945518_10205741779287430_7335511967658838426_n.jpg?oh=7b996b75f17a4cf2a29d5088d7b7aa61&oe=57E0A4DA” ]ইলোরা জামান[/author]

3261459325_7d092d1839_b d

প্রথমেই বলে নিচ্ছি, আমার লিখাটি বড়। পড়তে বেশ কয়েকমিনিট লাগবে। সুতরাং আপনার ইচ্ছে থাকলে আগে থেকেই এড়িয়ে যেতে পারেন এবং এড়িয়ে গিয়ে ইন্টার্নেটে ভিডিও দেখতে পারেন। সেটি যদি আপনার কাছে সময় নষ্ট না মনে হয়, তবে তাই করুন। এখানে সময় নষ্টের দরকার নেই। আমার ফেইসবুক আমার একান্তই নিজের ভাবনা। কাওকে জোর করে পড়ানো হচ্ছেনা। ধন্যবাদ।

মডেল সাবিরা সুইসাইড করেছে। এই সুইসাইড করবার আগে সে ভিডিওচিত্র ধারণ করেছে। এবং সেটি শেয়ার হচ্ছে ফেইসবুকে। ব্যাপারটি অত্যন্ত ক্ষতিকর সমাজের জন্য। বিশেষ করে অল্প বয়সী আবেগী ছেলে মেয়েদের জন্য এটি ক্ষতকর প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি। কেননা এই জিনিস তারা শিখে রাখবে। গেঁথে থাকবে তাদের মনে। এরপর এরকম আচরণ করবার জন্য ভেতর থেকে সাড়া আসবে যখন একইধরণের আবেগ কাজ করবে জীবনে কোনো মুহুর্তে।

সুতরাং প্রথম কথা হলো, এই ভিডিও শেয়ার করবেন না দয়া করে। এতে শিক্ষার কিছু নেই, বিনোদনের কিছু নেই। যারা দেখছে এই ভিডিও তারা যদি প্রাপ্ত মনষ্ক না হন তাহলে তারা এটিকে ফলো করবে প্রেমিক প্রেমিকার কাছ থেকে আঘাত আসলে। ভেতর থেকেই এই জিনিসে উৎসাহ পাবে। এক সময় হাত কেটে নাম লিখবার প্রচলন ছিলো। ভালোবাসা দেখাবার একটি বিশ্রী পদ্ধতি। আলটিমেইটলি এইসব হাত কেটে নাম লেখা প্রেমিক প্রেমিকারা কখনই হাত কেটে তাদের ‘ভালোবাসার মানুষ’দের ফেরাতে পারেনি। সুতরাং এগুলো একেবারেই অকর্মণ্য কাজ।

অনেকে সাবিরার আত্মহত্যাকে সাহসের কাজ বলে মনে মনে ভাবছেন। আত্মহত্যা করতে সাহস লাগে তবে সেটি কাপুরুষোচিত সাহস। এই সাহস মোটেও সাহস নয়। জীবনে যুদ্ধ করে বাঁচার নাম হলো সাহস। এভাবে নিজেকে হত্যা করা সাহস নয়, পরাজয়ের নাম। এবং এতে তার সিম্প্যাথী পাবারো কোনো কারণ নেই। এদের প্রতি আমার মমতা আসেনা। করুণা আসে। সিরিয়াসলি স্রেফ করুণা। এবং আক্ষেপ। সে জানলো না আজকের এই চমৎকার দিন আসলে কতটা চমৎকার!

দ্বিতীয়ত, অনেক ফেইসবুক বোদ্ধা এখানে সেই টিপিক্যাল স্টেরিওটাইপ নারীর দোষ-পুরুষের দোষ এইসব নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন আসল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে। এদেরকে দয়া করে হিট দেবেন না। দুইভাবে লেখা যায় এই বিষয়ে, লাইক পাবার উদ্দেশ্যে লিখে নিজেকে ভালো হিসেবে তুলে ধরা এবং আরেকটি হলো, আসলেই ভবিষ্যতে যেন কেউ এরকম না করে সেই চিন্তা মাথায় রেখে করা।

যারা প্রথম ভাগে আছেন তারা এখানে নারী চরিত্র খারাপ তুলে ধরবেন, এতে প্রচুর সমর্থন আসবে। তারা ধর্মকেও টেনে আনবেন। এতে সমর্থন দ্বিগুণ হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে আত্মহত্যায় আসলে ধর্মে মহাপাপ লিখা আছে, এই বাক্য কাজে আসেনা। যখন মানুষ এরকম মুহুর্তে যায় তখন ধর্ম-অধর্ম কাজে আসেনা। তাহলে পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মে যেখানে ইসলামের মত করে বলা নেই তারা কিছু হলেই হালকা সাহস জমিয়ে কষ্টের সময় সুইসাইড করতে পারতো।3261459325_7d092d1839_b d f

সুতরাং শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে একে ঠেকানো যাবেনা। কারণ জীবনে যে ধর্ম পালন করেনাই সে নিজেকে হত্যা করবার সময় ওইরকম নাজুক পরিস্থিতিতে ধর্মের কথা মনে আনবে না। এটাই সত্য। আত্মহত্যার টেন্ডেসি অতি ধার্মীক মানুষদের মনেও আসতে পারে। তবে আজকাল যেহেতু ধর্ম কেবলমাত্র ফেইসবুকেই সীমাবদ্ধ সেহেতু আমার এই কথা অনেকের ভালো লাগবে না, এটিও সত্য। কিন্তু ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে কেউ বড় হতে পারলে তখন এসব নিন্দনীয় অবৈধ সম্পর্ককে পাপ হিসেবে দেখে কেউ ওইপথে পা বাড়াবার সময় ভাববে, এটি পরিক্ষিত সত্য।

সাবিরা ড্রাগ অ্যাডিক্টেড থাকতে পারে কিংবা ঐকাজ করবার সময় কোনো ড্রাগ নিয়ে থাকতে পারে। যাতে মানুষের স্বাভাবিক চেতনা লোপ পায় এবং প্রচুর আবেগের উদগীরণ হয়। ক্ষতিকর আবেগ। ভিডিও করা ব্যাপারটি একটি নাটকের জন্ম দিয়েছে এবং এই নাটকের মাধ্যমে হয়ত সে প্রেমিকের প্রতি প্রতিশোধ ছুঁড়ে দিয়েছে কিংবা আসলেই মরে যাওয়া তার উদ্দেশ্য ছিলো না। অনেক কিছুই ভাবনা আসতে পারে যেহেতু আমরা সাবিরার পুরো জীবন দেখিনি।

সাবিরা সুইসাইড নোটে কিছু অতি কুৎসিত কথা লিখেছে যা মুদ্রনযোগ্য নয় আমার পক্ষে। কিন্তু অনেকেই দেখলাম তা তুলে দিচ্ছেন। ডোন্ট ডু দিস প্লিজ। এটি করবেন না। এতে ভালো কিছুই হচ্ছেনা। শুধুমাত্র এইসব কদর্য ব্যাপার মানুষের দৃষ্টি এবং কর্ন সওয়া করে ফেলছেন আপনারা। কিছুদিন পর এসব কথা লিখতে কেউ বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেনা। এই জিনিসটি বন্ধ হওয়া উচিত। এগুলো স্বাভাবিক ব্যাপার নয় আমাদের সমাজে। কিন্তু আমরাই এসবের নির্লজ্জ প্রকাশ করে স্বাভাবিক করে তুলছি এসব।

সে মডেল ছিলো। আর মডেলদের জীবন আমরা জানি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তাদের বসবাস ওসব কথার ভেতর। সুতরাং তার কাছে এইসব কদর্য কথা তেমন কিছু ব্যাপার নয় যা আমাদের কাছে অত্যন্ত নোংরা। সে লিখে গিয়েছে বলেই কি আমাদের ছড়াতে হবে নিজেকে তুমুল আপডেইটেড হিসেবে দেখাবার জন্য?

এইসব আত্মহত্যার প্রধান কারণ, অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন এবং পরিবারের উদাসিনতা। একটি পরিবার যদি পজিটিভ সাপোর্টিভ হয় তাহলে সেই পরিবারের সন্তানেরা এরকম কাজ করবার কথা মাথায় আনতে পারেনা। আপনার সন্তান, আপনার বন্ধু আপনার ভাই বোন কি করছে, কেমন জীবন যাপন করছে তা দেখবার দায়িত্ব আপনার।

এখানে অনেকেই মেয়েটির দোষ অধিক পরিমাণে দিচ্ছেন। কেননা এমনিতেই মেয়ে সংশ্লিষ্ট কথা আসলে অনেকের শরীরে টেস্টস্টরন প্রজেস্টরনের প্রবাহ বেড়ে যায়। অথচ বিবাহিত অনেক মেয়ে আছেন যাদের স্বামীরা তাদেরকে ফেলে চলে যান এবং মেয়েটি হয়ত চরিত্রহীন নয়। কিন্তু দুঃখ যন্ত্রণায় কখনো কখনো স্ত্রীটির মনে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। সুতরাং এখানে চরিত্রের দোষ দিয়েও এই আত্মহত্যার কথা লিখা পুরোপুরি ঠিক নয়।

বরঞ্চ, সেই ছেলেটি যে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে তার শাস্তিও হওয়া উচিত। নইলে যারা এসব কাজ করছে তারা আরো করতে থাকবে কারণ এতে দায়িত্ব নিতে হয়না অথচ আনন্দ পাওয়া যায় কিছু বোকা মেয়েদের বোকামীর সুযোগে। আজ যদি সাবিরাকে সে বিয়ে করতো তাহলে মেয়েটির হয়ত বাবু হতো, সংসার হতো, জীবন সুন্দর হতো। কিন্তু সেই অসভ্য লোভী ছেলে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু শারীরিক আনন্দ ঠিকই নিয়েছিলো।

একটি মেয়ের চাইতে একটি ছেলের অপরাধ এক্ষেত্রে অনেক বেশী। কারণ, মেয়েরা সহজে অন্তত এসব ব্যাপারে জড়াতে চায়না। এদেশে ছেলেরাই এক্ষেত্রে অগ্রগামী। এরপর মেয়ে জড়ায়। কিন্তু মেয়েদের চরিত্র হননে পারদর্শী এইসমাজ এই ভয়ংকর দিক এড়িয়ে গিয়ে আসলে অপরাধীকেই এড়িয়ে যাচ্ছেন। এবং ছেলেরা তার সুযোগ নিয়ে আবার এরকম করছে। অথচ দুই চারটার শাস্তি হলে ভবিষ্যতে ছেলেরা সতর্ক হতো।

পরিশেষে, সাবিরার এই কাপুরুষোচিত কাজের জন্য আমরা কোনও সিম্প্যাথি দেখাতে পারিনা বরং ভবিষ্যতের কেউ যেন সাবিরা না হয়ে ওঠে সেইদিকে দৃষ্টি দেবার অনুরোধ করি। আর রওনকদের শাস্তির আইন নেই, যেহেতু মিউচুয়াল সেক্সের পর বিশ্বাস ভঙ্গের আইন নেই। সুতরাং সামাজিকভাবে বয়কট করে কিংবা সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এদেরকে তীব্র নিন্দা জানিয়ে এদের শাস্তি দেয়া যেতে পারে।

উল্লেখ্য রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরের একটি বাসা থেকে মঙ্গলবার সকালে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সাবিরার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায় নির্ঝর সিনহা রওনক নামের এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে এই মডেলের প্রেম ছিল। দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বিয়ের ব্যাপারে অসম্মতি ছিল নির্ঝরের পরিবারের। বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যা করেন সাবিরা।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে সাবিরা হোসেন লেখেন, ‘আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। এটা তোমার ছোট ভাইকে বলা। সে আমাকে যা ইচ্ছে বলেছে। আর বেস্ট পার্ট হল, সে আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। আর আমার প্রশ্ন হল, তোমার কি একটুও ফিল হয়নি?’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘আমাকে ব্যবহার করবে, সেক্স করবে, আর আমি সরে যাবো। এটাতো হতে পারে না। বিয়ের কথা বললে তোমার পরিবার অসুস্থ হয়ে যায় আর সেক্সের কথা বললে সব ঠিকঠাক।’
সবশেষে নির্ঝরকে ট্যাগ করে তিনি লেখেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য সে (নির্ঝর) দায়ী। যদি আমি মারা যাই, তাহলে এর দায় তার।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *