ব্রাম্মনবাড়ীয়ার নাসির নগরে সংখ্যালঘুদের উপড় হামলা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিহঃপ্রকাশ

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন 

তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গ্লানীকর

হানা হানি ; তলোয়ার তুমি দাও নাই হাতে দিয়েছো অমর বানী।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত কবিতার কিছু অংশ উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে আজকের লেখাটার সুত্রপাত করলাম। বিশ্ব মানবতার কথা বলে যিনি গোটা পৃথিবীতে সকলের কাছে শ্রদ্ধা আর ভালবাসার একমাত্র মানুষে পরিনত হয়েছিলেন; তাকে নিয়েই কবি নজরুল ইসলাম এই অমর অনবদ্য কবিতা রচনা করেছিলেন। আর তিনি হলেন শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের বানীবহক হযরত মুহাম্মদ (স.) । কাজী নজরুল ইসলাম যে সময় জন্মেছিলেন সেই সময় তৎকালিন সমাজে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্পর্ক হীনতার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক শ্রেনীর সুযোগ সন্ধানী নষ্ট প্রকৃতির মানুষ নোংরা রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য নানা কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে সমাজের মাঝে বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতো। যা পরবতীতে দুই সম্প্রদায়ের মাঝে নানা সংঘাতের সুত্রপাত ঘটতো এবং তা চুরান্ত পর্যায়ে দাঙ্গায় রুপ নিতো। উপমহাদেশের ইতিহাসে অসংখ্যবার দাঙ্গার মতো অনাকাংখীত ঘটনা ঘটেছে। যার প্রক্ষাপটে একজন সচেতন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে কবি নজরুল দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে হানা হানিকে গলাগলিতে পরিনত করার যে চেষ্টা করেছিলেন ; এই কবিতা তারই একটা জ্বলন্ত দৃস্টান্ত। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্রাম্মনবাড়ীয়া জেলার নাসির নগরের এক হিন্দু তরুন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে মুসলমানদের হৃদয় স্পন্দন পবিত্র কাবার উপরে হিন্দু দেবতা শিবের ছবি বসিয়ে পোস্ট করেছে। আর এটাকে কেন্দ্র করেই একটি কুচক্রী মহল হিন্দু পরিবারের উপর যে নগ্ন হামলা চালিয়ে তাদের বাড়ী ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে ; যা অত্যন্ত গর্হিত এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ । প্রথমত আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে যে কারনে সুযোগ সন্ধানীরা এ ধরনের ন্যাক্কার জনক ঘটনা ঘটিয়েছে সেই বিষয়টি অবশ্যই অগ্রহনযোগ্য, নিন্দনীয় এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ । ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেওয়ার মতো এ ধরনের অপতৎপড়তা পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে চিন্তা করা যায় না । যে কারনে বিশ্বের অনেক দেশ এ ধরনের অপতৎপড়তার হাত থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে ব্লাসফেমী আইন করেছে । দ্বিতীয়ত যে কেউ এ ধরনের আক্রমন মূলক কাজ করে ফেললেই তার সম্পুর্ন দায়ভার তার সম্প্রদায়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের বাড়ী ঘড় ও ধর্মীয় উপাশানালয় ভেঙ্গে কিংবা শাররীক আঘাত করে এর শোধ নিতে হবে। এ ধরনের মানুষিকতাও কখনোই কাম্য নয়। এটা কোন ধরনের সভ্যতা । এটা কোনো সভ্য সমাজের কাজ নয়। এ ধরনের অপকর্মের প্রচলন ছিল অন্ধকার যুগে। যারা এ ধরনের কাজ করেছে সেই সকল অপরাধী ও তাদের ইন্ধন দাতাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃস্টান্ত স্থাপন করে ভবিষ্যতের নিরাপদ আর নিরাপত্তার বাংলাদেশ গড়ে তোলার বিকল্প নাই । নাসির নগরের এই হামলা নিয়ে অনেকে অনেক কিছু লিখেছেন। পক্ষে বিপক্ষে বেশ আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে দেশ এবং দেশের বাইরে। ক্ষমতাশীনরা স্হানীয় কয়েকজন নেতাকে বহিস্কার করেছেন। এটাকে আবার বিরোধী পক্ষ বলেছে , এই বহিস্কারের মধ্য দিয়ে প্রমানিত হয়েছে এই ঘটনা ক্ষমতাসীনদের লোকজনই করেছে । আক্রমনের শিকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বলছে তারা কি এ দেশে বাস করতে পারবে কিনা ইত্যাদি । এর মধ্যে স্থানীয় সাংসদ ও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীর মুখ দিয়ে হিন্দু

সম্প্রদায়ের বিষয়ে বেফাঁস শব্দও উচ্চারিত হয়েছে ; যা কাঙ্ক্ষিত নয়। এ ছাড়া শাহবাগে আওয়ামীলীগ নেতা মাহবুবুল হক হানিফের ওপড় এ ধরনের শিষ্টাচার বর্হিভূত আচরনও দেশের আপামর জনতা কামনা করেনা। ইতোমধ্যে স্হানীয় থানা র্নিবাহী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে । গ্রেফতার হয়েছে অনেকে। এই পক্রিয়ার শেষ কোথায় তা এখন বলা মুশকিল । তবে নাসির নগরের ন্যাক্কারজনক ঘটনা নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ এ দেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর বিছিন্ন ঘটনা ঘটেছে । তার বেশীর ভাগ ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর শাসনামলে। এর কি কারন তা হয়তোবা কোন দিন আবিস্কার করা যাবেনা । কিন্তু গত চল্লিশ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে হিন্দু সম্পত্তি দখল, পুজামন্ডপে হামলা এবং এদের ওপর আক্রমন হয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশী । অভিজ্ঞ মহল মনে করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার নোংরা মানুষিকতার কারনে সংখ্যালঘুরা বা বার ক্ষমতাশীনদের দ্বারা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়ে আসছে । নাসির নগরের ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমান হিসেবে এখন দেশময় আলোচনার বস্তুতে পরিনত হয়েছে । স্বাধীনতা পূর্ব এবং এই সরকার ক্ষমতার বাইরে থাকাকালিন সময় দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অনেক নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করে। আমার আদি বাসস্থান বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জে । জন্ম ঢাকায় হলেও ছেলেবেলা বছরে একবার গ্রামে স্বপরিবারে যেতে হতো। দাদা-দাদী বেচেঁ থাকাকালিন সময় গ্রামে যাওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। গ্রামে গেলে নানা বাড়ীতে বেশীরভাগ সময় অবস্থান করতাম । আমার নানা বাড়ীর আশপাশের বেশীরভাগ বাড়ী গুলো ছিল হিন্দু বাড়ী। আমার মায়ের সমবয়েসী হিন্দু মহিলাদের আমারা খালা বলে সম্মোধন করতাম । তারাও বোনের ছেলের মতো আমাদের আদর করতেন। সন্ধ্যা হলে নানা বাড়ীর আঙ্গিনায় গানের আসর বসতো । আমার বড় মামা মানিক মোল্লা ভাল গান গাইতেন। মধ্য রাত পর্যন্ত চলতো পালা গানের আসর। গান শুনতে

শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পরতাম মায়ের বান্ধবী হিন্দু খালা বাসন্তির কোলে

তার কোনো

ঠিক ছিল না। কোনো কোনো রাতে নতুন চাল দিয়ে খেজুর রসের পায়েস তৈরী করে সবাই এক সঙ্গে বসে খেতো। সকলে সকলের প্রতি ছিল শ্রদ্ধাশীল। একে অপরের সুখ দুঃখের ভাগি হতো। আর একটি ঘটনা না বললেই নয় ২০০৪ সালে পিরোজপুর এর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর একটি রিপোর্ট করার জন্য পারের হাট এলাকায় ৪দিন অবস্থান করে ছিলাম। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট তখন সরকার পরিচালনা করছিল। ঐ এলাকার কয়েকটি হিন্দু প্রধান গ্রামে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে যেয়ে অনেক হিন্দু পরিবারের সাথে আমার সরাসরী কথা হয়। সবাই এক বাক্যে বলেছেন তারা সবাই অনেক ভাল আছেন। তাদের মধ্যে রনো যুগী নামে একজন বয়স্ক মানুষের মন্তব্য আজও স্মৃতিতে ধরে রেখেছি। তিনি বলেছিলেন , ডিমের ভিতরে কুসুম যেমন নিরাপদ থাকে আমরা এখন তেমন নিরাপদে আছি।আজকের বাংলাদেশকে যখন প্রবাসে বসে মিডিয়ায় দেখি ; তখন অতীত দিনের স্মৃতি কেবলী বেদনার্ত করে তোলে হৃদয় । সেই সহ-অবস্হানের শান্তির দেশটিতে কারা অশান্তির বিষবাষ্প ছড়ালো। কবি নজরুলের সময়ে বৃটিশ ভারতে যারা সমাজকে অস্থির করে তোলার জন্য দাঙ্গা বাজাতো ; আজ তাদেরই পেতাত্বারা শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশে একটার পর একটা অঘটন ঘটিয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র ভেঙে পরছে রাস্ট্রীয় কাঠামোর ভীত। এভাবে অনিশ্চিত যাত্রার দিকে একটা রাস্ট্র চলতে পারেনা। স্টান্ডাবাজীর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে জনকল্যান মুলক ভুমিকায় যদি শাসক শ্রেনী না দাড়ায়; তাহলে দেশের গনতন্ত্র দীর্ঘ দিনের জন্য বিদায় নেবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে। নাসির নগরের বসবাসরত হিন্দু পরিবারের ভাই বোনদের বলতে চাই , এদেশ সকল ধর্মের মানুষের জন্য বসবাসের নিরাপদ স্থান ও শান্তির আবাস। সেই মধ্য যুগ থেকে যার সুত্রপাত ঘটেছিল ;তা আজও স্বগৌরবে চলমান। কোন বৈরী মন্তব্য নয়। সবার জন্য বাংলাদেশ এই শ্লোগানে মুখরীত হোন। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিরাপদে বাস করার। আর সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে জোটবদ্ধভাবে একতার বন্ধন সৃষ্টি করে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ব্যুহ রচনা করে সেই সোনালী দিন ফিরিয়ে আনুন। যেনো আমারা ,আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম , এই গানের স্বার্থকতা খুজেঁ পাই।
লেখকঃ প্রবাস থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.