বিশ্ব মিডিয়া ও প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

[author image=”http://www.nobokontho.com/wp-content/uploads/2017/06/AB-Siddik-d.jpg” ]আবু বকর সিদ্দিক[/author]

মিডিয়া। এই শব্দটি আমাদের সামনে আসলেই আমরা প্রথমত ভাবি, আমাদের সামনে ঘটে যাওয়া সর্বশেষ নানারকম তথ্য বা নিউজ যা আমরা বিভিন্ন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পেয়ে থাকি।
প্রধানত প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এই দুয়ের সমন্বিত রুপ হচ্ছে মিডিয়া জগৎ। আজকের বিশ্বে মিডিয়া আমাদের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌছে গিয়েছে। আজকের দিনে বিশ্বের বড় বড় মোড়ল থেকে শুরু করে গ্রামের কাউন্সিলর পর্যন্ত সবাই মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত।

বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্যান্টিন থেকে শুরু করে হাউজ অব লর্ডস বা বাকিংহাম প্লেস কিম্বা ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট; আবার মার্কিন মুল্লকের সেরা স্থান হোয়াইট হাউজে কি নিয়ে আজকের গল্প ঠিক হবে তা ঠিক করে দেয় মিডিয়া। তাতি, জেলে, মুচি থেকে নিয়ে জেলার প্রশাসক সবাইকে প্রভাবিত করে মিডিয়া। এই যুগকে বলা হয়ে থাকে মিডিয়ার যুগ।

এখন মিডিয়া এমন এক শক্তি, যার মাধ্যমে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষকে করে তোলে সাহসী। সংখালঘুদের প্রভাব ফেলে দেয় সংখ্যাগুরুদের উপর। আবার বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পরাজয়ের মুখামুখি করাতে সক্ষম এই মিডিয়া। মার্কিন মুল্লকে গত কয়েকদিন আগে যে নির্বাচন হয়েছিল তার ফলাফল অনেকেই না মানতে পেরে রাস্তায় হাজার হাজার প্রতিবাদী জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এর মূল হোতা ছিল মিডিয়া।

মিডিয়া একুশ শতকের এই সময়ে মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে গিয়েছে। নরওয়ের নর্থ কেপ থেকে শুরু করে চিলির পুন্টো আরেনাস পর্যন্ত যে কোন নিউজ আমরা মূহুর্তে পেয়ে যাই এই মিডিয়ার বদৌলতে। বাংলার টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া যে কোন নিউজ আমরা পাই এই মিডিয়ার সহযোগিতার কারণে। কিছুদিন আগে যাদের বক্তব্য ছিল ৫০ ভাগ যুদ্ধ হয় রণাঙ্গনে আর ৫০ ভাগ মিডিয়ায় আফগান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন, ফিলিস্তিন, পাকিস্তান, মিশর, তিউনিশিয়া আর এর মধ্যে তাহরির স্কয়ার এর সেই গনঅভুথ্যান এই সব কিছু দেখার পর সমালোচকদের মনে হয়েছে মাত্র ২০ ভাগ যুদ্ধ হয় রণাঙ্গনে আর ৮০ ভাগই সম্পন্ন হয় মিডিয়ায়।

যারা ইতিহাস চর্চা করে তাদের জানা বর্তমান রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে USSR বলা হয় যাদের, তাদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে প্রথম দ্বন্দ্ব ঘটে এই মিডিয়ার কারণে। মিডিয়াই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার মূল কারণ। ঘরের মানুষকে রাস্তায় আর রাস্তার মানুষকে ঘরে নিয়ে যাওয়ার মত ক্ষমতা রাখে মিডিয়া।

স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও আমাদের দেশের মিডিয়াগুলো অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীন হয়ে উঠতে পারে নাই। এক শ্রেণীর মুক্তমনা, প্রগতিবাদী, আধুনিকতার পূজারী সম্পাদক, লেখক, পরিচালক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক খুব করে চাইছেন আমাদের দেশটা যেন পশ্চিমা এবং ওপারের সংস্কৃতির স্রোতধারায় গা ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু এই নষ্ট সংস্কৃতির কালো থাবায় সে সমাজের শিশু কিশোর, যুবক যুবতিদের নৈতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র বিভিন্ন প্রযুক্তি ও স্যোশাল মিডিয়া ধারণ করে আছে, তা খুবই ভয়াবহ, যা প্রকাশ করার মত ভাষা নেই।

যেকোনো দেশের মিডিয়া দেশ ও জাতির জাগ্রত প্রহরী। বাংলাদেশ বলুন আর আমেরিকা বলুন! মিডিয়া যেকোন দেশের জন্য যেকোন সময় বিশেষ কাজে লাগতে পারে আবার এটা দেশের বিরুদ্ধে কাজ করলে দেশ ও জাতির জন্য অনেক সময় হুমকিস্বরূপ হয়ে যেতে পারে। মিডিয়া হওয়া উচিত মানবতার জন্য। সেখানে যদি মিডিয়ার কণ্ঠরূদ্ধ করা হয়, তাহলে বিশ্বের প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ বিচারের জন্য কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। মানুষের কষ্ট কে দেখবে? মানুষের অসহায় আর্তনাথ ঘুরে বেড়াবে নিভৃতে কেও রাখবে না কারো খবর এমন তো হতে পারে না।

বিশ্বায়নের চটকদার স্লোগান দিয়ে বিশ্বের ধনী দেশগুলো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থে বর্তমান বিশ্বের টেকনোলজি তথা আকাশ সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের কালচার ও রাজনীতি উভয়টিকে আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের মিডিয়াগুলোও বিশ্বায়নের বাউরি বাতাসে গা ভাসিয়ে আমাদের স্বতন্ত্র পরিচিতিপ্রাপ্তকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তারা আধুনিকতার দোহাই দিয়ে আমাদের মূল্যবোধ ও সমাজ কাঠামোর সংগে বিদেশী সংস্কৃতি আমদানি করছে। এর বহি:প্রকাশ হচ্ছে আমাদের প্রজন্ম আজ হলিউড, বলিউড, এমটিভি আভিজাত্য ও সংস্কৃতির প্রতিক হয়ে উঠেছে।

যুব সমাজ সমকাম, নুডিজম, পর্ণফ্লিম, লিভটুগেদার এর প্রতি ঝুঁকছে। তাদের পোশাকে ও নানা রকম স্টিকার দেখা যায় আজকাল যা ভাষায় প্রকাশ করার মত না।

জ্ঞানিরা বলেন, গ্লোবালাইজেশন আসলে দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, মূল্যবোধ ভেংগে চুড়ে এক সামান্তরালে মূল কথা বললে নোংরা সংস্কৃতি আনতে চায়। মিডিয়া বহুজাতিক কোম্পানির পণ্যের বিজ্ঞাপনে হিডেন সেক্স, নাটক বা সিনেমায় বাস্তবতা বিবর্জিত ও মূল্যবোধহীন বিজাতীয় কালচারের দিকে তরুণ তরুণীদের ইচ্ছায় অনিচ্ছায় ঝোঁকাচ্ছে, যদিও বা খুব বেশি দিন নাই হয়তো পুরো গ্রাস করে ফেলবে। তাই সম্পূর্ণ গ্রাস করার আগেই আমাদের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশ ও জাতির স্বার্থ বিবেচনা করে ইতিবাচক মিডিয়া ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আবু বকর সিদ্দিক

[শিক্ষার্থী ও ক্ষুদে লেখক]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.