লিখেছেন – ফারুক নেওয়াজ খাঁন সুমন
সম্পাদক , ইউরোবার্তা ।
হে বিজয়ী বীর ছিলো জয় তব ব্রত:বিকালে কাজ সেরে বাসায় ফিরেছি। কাজ বলতে বলি খেপ। অর্থাৎ নিয়মিত কাজের বাইরে অন্য কোন কাজ করা। (আমাদের ছোটবেলায় কোন ক্লাবের পক্ষে নিয়মিত খেলার পর অন্য কোন ক্লাবের হয়ে ভাড়ায় খেলাকে আমরা খেপ বলতাম।) আমিও জীবন জীবিকার প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট কাজ করি। পাশাপাশি ফ্রান্সের অভিবাসন দপ্তরে খন্ডকালীন দোভাষীর কাজ চালিয়ে যাই। এটাকে আমি সব সময় খেপ বলতে পছন্দ করি। কারন এটা আমার মুল কাজ না।
যাই হোক আজ প্যারিসে একটি খেপ সেরে বাসায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মুঠোফোন বেজে উঠলো। বাইরের কাপড় ছাড়তেও পারিনি এমন সময় ফোন। মুঠোফোনের পর্দায় যার নাম উঠেছে সেটা দেখে না ধরে পারলাম না।
উত্তরবঙ্গীয় টানে কথা বলা শুরু করলেন প্রিয় মইনুদ্দীন খান ভাই।
আমরা ডাকি মাইন ভাই বলে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গীয় জেলা শহর পাবনার মানুষ।
অত্যন্ত আন্তরিক মাইন ভাই জানালেন ফ্রান্সে বৈধভাবে থাকার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কাজের বিনিময়ে বৈধতার আওতায় (বিখ্যাত ভালস সার্কুলার) পড়েছেন তিনি। এজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাদের মাইন ভাইয়ের।
কাজের বিনিময়ে বৈধতার বিষয়টি একটু খোলাসা না করলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। ২০১২ সালে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া ওল্যান্দ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভালস (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন) ফ্রান্স জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিদেশীদের বৈধ করার জন্য একটি সার্কুলার বা প্রজ্ঞাপন জারি করেন। সে প্রজ্ঞাপনের বদৌলতে স্থায়ী কাজ থাকলে ফ্রান্সে বৈধভাবে থাকার অনুমতি প্রদানের বিধান রাখা হয়। সেটিই ভালস সার্কুলার হিসেবে পরিচিত।
সার্কুলারটি ২০১২ সালে হলেও আমাদের মাইন ভাই এর সুফল ভোগ করলেন প্রায় পাচ বছর পর।
পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতির পুর্বেই মাইন ভাই সম্পর্কে বিস্তারিত বলার চেষ্টা করছি। ২০১১ সালটি ফ্রান্সে অবস্থিত বাংলাদেশী প্রবাসীদের জন্য একটি দুর্ভোগের বছর। এ বছরে ফ্রান্স সরকারের শরনার্থী বিষয়ক দপ্তর বাংলাদেশকে নিরাপদ রাষ্ট্র ঘোষনা করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের কোন নাগরিক ফ্রান্সে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারবে না। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এ সিদ্ধান্তের পর ফ্রান্সে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি নিরাশা বিরাজ করে। অস্বীকার করার যো নেই ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশীদের একটা বড় অংশ রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছে। বাংলাদেশে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা দেখিয়ে শরনার্থী আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়। আমি নিজেও এর বাইরের কেউ না।
বাংলাদেশকে নিরাপদ রাষ্ট্র ঘোষনা করলে সে দেশের কোন নাগরিক ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সমস্য দেখিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করতে পারবে না।
বাংলাদেশ বিষয়ে যখন এ সিদ্ধান্ত আসলো তখন সেটা মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে গেলো। ফ্রান্সে বাংলাদেশী অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় সেটা টক অব দ্য টাউনে পরিনত হলো। কিভাবে এ অবস্থা থেকে পরিত্রান পাওয়া যায় অর্থাৎ বাংলাদেশকে নিরাপদ রাষ্ট্রের তালিকা থেকে কিভাবে মুক্ত করা যায় সেটাই মুল আলোচ্য বিষয় ছিলো।
২০১১ এর ডিসেম্বরে সারকোজি সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১২ সালের জানুয়ারী মাসে ফ্রান্সে বাঙ্গালীদের প্রানকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গার দু নর্দে’র বাঙ্গালী ব্যবসায়ী টি এম রেজা এ বিষয়ে একটি সার্বজনীন বৈঠকের আহবান করেন।
সেটা ২০১২ সালের জানুয়ারী মাস এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তারিখটা মনে থাকলে যদ্দুর মনে পড়ে মধ্য জানুয়ারীতে রেজা ভাইয়ের রেস্তোরায় প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশীরা বৈঠকে বসে। বৈঠক চলাকালীন সময়ে এক ভাই খবর দিলো প্যারিসের অদূরে মেট্রো হোস এলাকায় একই বিষয়ে কিছু মানুষ আলোচনায় বসেছে।
সে সময় অনেকেই খন্ড খন্ডভাবে এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্বপন ভাই প্রস্তাব দিলেন ওদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। একতাই বল এ নীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশী ভাইয়েরা আর সময় নষ্ট না করে তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নিলো সেখানে যাবার।
সিদ্ধান্ত হলো একটি প্রতিনিধি দল সেখানে যাবে। রেজা ভাইয়ের গাড়ীতে সন্ধ্যার সময় কয়েকজন সেখানে গেলেন। প্রতিনিধি দলে রেজা ভাই, মোমিন ভাই (শরীফ আল মোমিন), সংবাদকর্মী এম এ হাশেম, খান বাবু রোমেল এবং আমি ছিলাম। আমাদের সঙ্গে সেখানে যোগ দিলো স্বপন ভাই।
মেট্রো হোসের একটি কফির দোকানে আমাদের বৈঠক শুরু হলো। সেখানে আব্দুল মালেক সহ জনা পচিশ বা একটু বেশী লোক উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার মুল বিষয় ঐক্যবদ্ধভাবে কিছু করা। আলোচনা ফলপ্রসু হওয়ায় পরবর্তীতে একটি কমিটির অধীনে ঐক্যবদ্ধভাবে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করে স্মারক লিপি পেশ করা হয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে।এ বিষয়ে পরে কোন এক সময় লেখা যাবে।
ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করার প্রথম মিটিংয়ে সাতজনকে নেতা নির্বাচন করা হয়।সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে একটি শোভাযাত্রা করা হবে। প্রায় তিনহাজার বাংলাদেশীর সমাবেশ ঘটানোর বিষয়ে ঐক্যমত হয়।
আয়োজনটি ব্যয়বহুল ছিলো বিধায় তহবিল সংগ্রহের বিষয়টি প্রথমেই আলোচনায় আসে। সে সময় সবার আগে নিজ পকেট থেকে কড়কড়ে পঞ্চাশ ইউরোর একটি নোট বের করে দিয়েছিলেন আমাদের মাইন ভাই।
আমারে চোখে এখনো সে দৃশ্য ভাসে। সাময়িক অবস্থানের জন্য ফ্রান্স সরকার সে সময় আমাদেরকে জনপ্রতি দৈনিক নয় ইউরো করে দিতো। সাকুল্যে সে অর্থে নিজের জীবন চালানোই কষ্টকর ছিলো। মাইন ভাই বাঙ্গালীদের এ বিপদের দিনে ঝুকি নিয়ে পঞ্চাশ ইউরো দিয়েছিলেন।
সেদিন অনেক প্রতিষ্ঠিত বাঙ্গালী আমাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি এ রকম আন্দোলন না করার জন্য নিরুৎসহিত করেছিলেন।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ২৯ তারিখ বুধবার প্যারিসে স্মরনাতীত কালের সর্ববৃহৎ সমাবেশ করেছিলো বাংলাদেশীরা। সে সমাবেশের নেপথ্য কারিগর হিসেবে যারা কাজ করেছিলেন তারা নমস্য।
আমাদের মাইন ভাই বাঙ্গালীদের দাবীর জন্য সংগ্রাম করলেও দীর্ঘ পাচবছর পর ফ্রান্সে বৈধতা পেলেন।
এ পাচ বছরে সেইন নদীতে অনেক জল গড়িয়েছে। আল্পসের অনেক বরফ গলে জল হয়েছে। আমাদের মাইন ভাই নিজেই বিজয়ী হয়েছেন।
