ফ্রান্সের বাংলা সাংবাদিকতা : শামসুল ইসলাম

ফরাসী ভূখন্ডে বাংলাদেশীরা ঠিক কবে থেকে বসবাস শুরু করেছেন তার সঠিক কোন ইতিহাস যানা যায় না। তবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬১ সালে পাকিস্থান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারী পদ মর্যাদায় প্যারিস দূতাবাসে যোগদান করেন। বিয়ে করেন একজন ফরাসী মহিলাকে, চাকুরী শেষে আর দেশে ফিরেননি, এখানেই থেকে যান এবং ১৯৭১ সালে প্যারিসেই মারা যান। সে হিসেবে শিল্প সংস্কৃতির দেশ ফ্রান্সে, বাংলাদেশীদের আগমন অনেকটাই সাম্প্রতিক। মূলত ৯০ দশকের শেষের দিক থেকে বাংলাদেশীরা ফ্রান্সে কিছুটা স্থায়ী হতে শুরু করলেও এই শতাব্দীর শুরু থেকে তারা ধীরে শেকড় গড়তে থাকেন। তখন থেকে আজ, ফ্রান্সের বাংলাদেশী কমিউনিটির পরিসর প্রায় পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।
অন্যান্য দেশের মত ফ্রান্সেও বাংলাদেশীরা ধীরে ধীরে তাদের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে থাকেন। আর এক্ষত্রে সংবাদ কর্মীদের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। একটা সময় আজকের মত এত সংবাদকর্মী যেমন ছিল না, তেমনি যেকোন সংবাদ দেশের কোন পত্রিকায় প্রেরণ ও প্রকাশও এত সহজ ছিল না। কঠিন সময়ে নিজেদের সুখ-দুঃখ, অর্জন পাওয়া না পাওয়ার কথা হাজার হাজার মাইল দূরে নিজের মাতৃভাষায় বাংলা পত্রিকায় তুলে ধরেছেন তারা। শুরুর সেই দিনগুলোতে যেসব সংবাদকর্মী এই কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অন্যতম হলেন, খান জামাল, আব্দুল মান্নান আজাদ, খান ইকবাল প্রমুখ। তবে তখন তারা প্রিন্ট মিডিয়ায় কমিউনিটির বিভিন্ন সংবাদ প্রচার করতেন।
দুই দশক আগে আজকালকার মত টিভি মিডিয়ার এমন রমরমা অবস্থা ছিল না। ফলে টিভি মিডিয়ায় কাজ করার সুযোগও ছিল সীমিত। চ্যানেল এস এর ফ্রান্স প্রতিনিধি হিসাবে এখানে প্রথম টেলেভিশন সাংবাদিকতা শুরু করেন আব্দুল মান্নান আজাদ। এর পর একে একে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের ফ্রান্স বা প্যারিস প্রতিনিধি হিসাবে কাজ শুরু করেন, স্বপন, নূরুল ওয়াহিদ, দেবেশ বড়ুয়া, এম এ হাশেম, খান বাবু রুমেল, ইমরান মাহমুদ, শাহীন, ফয়সাল দ্বীপ, ফারুক নেওয়াজ খান, আবু তাহির, ফেরদৌস করিম আখঞ্জি, লুৎফুর রহমান বাবু, আব্দুল মালেক হিমু, এনায়েত হোসেন সোহেল, নয়ন মামুন, শামসুল ইসলাম প্রমুখ। আজ এদের অনেকেই আবার একাধিক টিভি চ্যানেলের হয়ে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।
ফ্রান্সে অনেকেই বিভিন্ন সময় ষাণ্মাসিক, ত্রৈমাসিক, মাসিক, পাক্ষিক বা সাপ্তাহিক কিংবা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে নানা প্রতিকুলতায় অধিকাংশ প্রকাশনাই নিয়মিত হতে পারেনি। এক্ষত্রে স্মরণ করা যায় সোহেল ইবনে হোসাইন ও ফারুক নেওয়াজ খানের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘প্যারিস থেকে’, অধ্যাপক অপু আলম সম্পাদিত ‘প্রবাসে বাংলা’,লিটন হায়দার সম্পাদিত ‘রাঙা প্রভাত’, নিয়াজ উদ্দিন হিরা সম্পাদিত ‘নবধারা’, আব্দুল আউয়াল দ্বীপের সম্পাদনায় ‘বাংলা এক্সপ্রেস’, শামসুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘ফ্রান্স বাংলা দর্পণ’, আব্দুল মালেক হিমুর সম্পাদনায় ‘প্যারিস বার্তা’ প্রভৃতি পত্রিকার কথা। আছে বদরুজ্জামান জামান সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘স্রোত’, আবু ফাহমি সম্পাদিত ‘সাহিত্য জমিন’। তবে প্যারিসের বাংলা পত্রিকার বাক পরিবর্তনের পত্রিকা বলা যায়, আবু তাহির সম্পাদিত পাক্ষিক নবকন্ঠ। বর্তমানে এটি ফ্রান্সের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে এক যোগে প্রকাশিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত একমাত্র নিয়মিত পত্রিকা হিসাবে নবকন্ঠ এখনো টিকে আছে।
বিগত বছরগুলোতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সজোরে নাড়া দিয়ে, আভির্ভূত হয়েছে অনলাইন পত্রিকা। বলা যায় বর্তমান বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ অনলাইন পত্রিকাগুলো। এখন প্রায় সব বড় বড় পত্রিকার রয়েছে অনলাইন ভার্সন। আবার বিশ্বের অনেক নামীদামী পত্রিকা তাদের প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে এ অনলাইন পত্রিকার দৌরাত্মে। ফ্রান্সের বাংলা সাংবাদিকতার জগতেও যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু অনলাইন পত্রিকা। আব্দুল মান্নান আজাদের “প্যারিস ভিশন” পত্রিকার মাধ্যমে ফ্রান্সের বাংলা অনলাইন পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। এর পর ইমারান মাহমুদের সম্পাদনায় বের হয় “ইউরো বিডি ২৪.কম”, শামসুল ইসলাম সম্পাদিত “এফবিডি২৪.কম” (ফ্রান্স বাংলা দর্পণ), আবু তাহির সম্পাদিত “নবকন্ঠ”, ফারুক নেওয়াজ খান সম্পাদিত “ইউরো বার্তা২৪.কম”, লুৎফুর রহমান বাবুর পরিচালনায় “আমাদের কথা২৪.কম”, মিজান রহমান সম্পাদিত “পূর্ব দিগন্ত.কম”। এর বাইরে আব্দুল মালেক হিমুর সম্পাদনায় “প্যারিস বার্তা ব্লগ”, ফেরদৌস করিম আখঞ্জি সম্পাদিত প্রবাসের আলো২৪.কম ও আজিজুর রহমান সম্পাদিত “সুরমা মেইল” ব্লগ প্রকাশিত হচ্ছে।
ফ্রান্সের বাংলা মিডিয়ার পালে নতুন পালক সংযোজন করতে যাচ্ছে “ইউরো বাংলা টেলিভিশন”। ইতিমধ্যে চ্যানেলটি তাদের পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করেছে। কেবল ফ্রান্স নয় বরং সমগ্র ইউরো জোনের প্রথম বাংলা টিভি চ্যানেল এটি।
এবার আসা যাক ফ্রান্সের বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সংগঠনের কথায়। জানা যায় “সাংবাদিক ইউনিয়ন অন ফ্রান্স” নামে ফ্রান্সে প্রথম বাংলাদেশী সাংবাদিক সংগঠন গঠিত হয় ২০০৩ সালে। শুরুতে এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন খান জামাল এবং সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন আব্দুল মান্নান আজাদ। পরবর্তীতে এ সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আব্দুল মান্নান আজাদ ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন খান ইকবাল। এটিই ফ্রান্সের প্রথম রেজিস্টার্ড বাংলাদেশী সাংবাদিক সংঠন। আজকের অনেক প্রতিষ্টিত সাংবাদিকও শুরুতে এ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ফ্রান্সে বাংলাদেশী কমিউনিটির কলেবর যত বাড়তে থাকে তেমনি বাড়তে থাকে বাংলাদেশী সাংবাদিকের সংখ্যা। এ প্রেক্ষিতে একটি প্রেসক্লাবের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন সংবাদকর্মীরা। এভাবনা থেকেই ২০১১ সালে দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর উপস্থিত সাংবাদিকদের গোপন ব্যলটে, ভোটের মাধ্যমে ফারুক নেওয়াজ খানকে সভাপতি ও দেবেশ বড়ুয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে “ফ্রান্স বাংলা প্রেস ক্লাবে”র যাত্রা শুরু হয়। তবে তৎকালীন সাংবাদিকদের মতপার্থক্যের কারনে পূর্ণাংগ কমিটি ঘোষণার আগেই প্রেসক্লাপটি মুখ থুবড়ে পড়ে। এদিকে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকরা আবার নতুন করে একটি প্রেসক্লাবের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দফায় দফায় তারা বৈঠক করেন। একটি খসড়া সংবিধানও প্রণয়ন করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর ২০১৪ সালের… তারিখে “প্যারিস বাংলা প্রেসক্লাবে”র আত্মপ্রকাশ ঘটে। সাংবাদিক আবু তাহিরকে সভাপতি ও এনায়েত হোসেন সোহেলকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি পূর্ণাং কমিটি গঠন করা হয়। প্যারিসের সৃজনশীল, তুখুড় ও মেধাবী সাংবাদিকদের প্রায় সকলেই সমবেত হন প্যারিস বাংলা প্রেসক্লাবের ছায়াতলে। কেবল সাংবাদিকতার মান উন্নয়ন নয়, বরং কমিউনিটির সকল ইতিবাচক কাজে প্রধাণ নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে সাংবাদিকদের এ সংগঠন। ফলে দ্রুত সমাজের প্রতিটি স্থরে একটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয় সংগঠনটি। এভাবে সংগঠনটি সাফল্যের সাথে তার দুই বছর পূর্ণ করতে সক্ষম হয়। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী দুই বছরের মাথায় যথা নিয়মে নতুন কার্যকরী কমিটি গঠিত হয়। এভাবেই ফ্রান্সের সাংবাদিক, সাংবাদিকতা ও কমিউনিটির সেবায় সব সময় কাছে থাকার চোয়াল বদ্ধ প্রতিজ্ঞা প্যারিস বাংলা প্রেস ক্লাবের।
লেখকঃ সিনিয়র সহ সভাপতি, প্যারিস বাংলা প্রেসক্লাব।

সম্পাদক – ফ্রান্স বাংলা দর্পণ। মোহনা টিভি, ফ্রান্স প্রতিনিধি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.