এয়ারপোর্টে বিদায় দেয়াটা খুবই ইমোশোন্যাল, এমনকি কঠিন মনের মানুষ হলেও। এবং সেই সাথে যারা জীবনের প্রথম অচিন দেশে অজানা উদ্দেশ্যে পারি দেন তাদের জন্য পুল সেরাত পার হওয়ার মতোই কঠিন ব্যাপার। এই মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যে কোন ব্যক্তির জন্যই মানসিক এবং শারীরিক ধকলের বিষয় , তাই পৃথিবীর যে কোন নূন্যতম সভ্য দেশে এই বিষয়টি খেয়াল রেখে এয়ারপোর্টের ডিজাইন করা হয় মানুষের যাবতীয় প্রয়োজন এবং সুযোগ সুবিধা রেখে।
কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে ঠিক তার উল্টোটা করা হয়। আপনার যাত্রা কতভাবে অশুভ করা যায়, কতভাবে আপনাকে হেনস্থা করা এবং কতভাবে আপনাকে বিপদে ফেলা যায় তার নাম ঢাকা শাহজালাল এয়ারপোর্ট। সারা বাংলাদেশের দূরদূরান্ত থেকে মানুষ রাতের বাসে, ট্রেনে, হায়ার করা মাইক্রোবাসে পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকা এয়ারপোর্টে আসে। সকলেই জানেন যারা জীবনের প্রথমবার বিদেশে চাকুরীর জন্য যায় তাদের জ্ঞাতি গুষ্টি সবাই আসে বিদায় জানাতে।
কিন্তু এরা প্রথমেই ধাক্কা খায় , ঠিক যখন এয়ারপোর্টে ঢুকতে যায় , যেখানে গাড়ি থেকে নামবে তার আগে লোহার গেট দেয়া আছে। সেখানে গার্ড পেসেঞ্জারের সাথে থাকা সমস্ত লোকজনকে নামিয়ে দিবে ! খুব জোরাজোরি করলে ১/২ জনকে পেসেঞ্জারের সাথে ঢুকতে দেয়। এখন এই বাকি ১০ থেকে ২০জন লোক যেখানে একজন দুধের শিশু থেকে ৮০ বছরের ননী-দাদীও আছেন তারা কোথায় যাবে? হয়তো তারা সারা রাত ৭/৮ ঘন্টা বাসে করে অথবা গাড়ি করে মাত্র এয়ারপোর্টে পৌঁছেছে। তাদের সর্বপ্রথম প্রয়োজন টয়লেটে যাওয়ার। কিন্তু কোন উপায় নেই কেউ যদি টয়লেটে যেতে চায়। কেউ হয়তো আগের দিন সন্ধ্যায় এসেছে পরের দিন ভোরে ফ্লাইট বলে, যদিও আসলে ফ্লাইট দুপুরে, দালাল বলে দিচ্ছে আগে আসতে। তাদের প্রয়োজন শুধু টয়লেট নয়, প্রয়োজন খাবারও।
কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে বিমান বন্দর রেল স্টেশনের সামনে না আসলে তাদের ভাগ্যে কোন খাবার জুটবে না। খাওয়া শেষে এরা যদি পায়ে হেঁটে আবার এয়ারপোর্টে ঢুকতে চায় তখন গোল চক্করেই গার্ড তাদের সিকিউরিটির জন্য থামিয়ে দেবে। এয়ারপোর্টে ঢুকতে হলে আপনার গাড়ি লাগবে, পায়ে হেঁটে যাওয়া যাবে না, বাংলাদেশের প্রেস্টিজ আছে না!
একজন বিদেশগামী মানুষের পরিবারের জন্য এই যে চরম অসভ্যতা , চরম হয়রানি তা বাংলাদেশের দারুন সভ্য, বিদেশ থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত কোন কর্মকর্তারই চোখে পড়ে না। কারণ, তাদের জানা মতে শুধুমাত্র গুলশান বনানীতে থাকা গাড়িওয়ালা লোকেরাই মরুভূমিতে যেয়ে খেঁজুর গাছ পাহারা দেয়, শপিং মলের টয়লেটে ক্লিনারের কাজ করে। তারা প্রাডো গাড়ি দিয়ে আসে আর বিমানে চড়ে যেয়ে শেখদের বাড়িতে কুকের কাজ করে, দেশের কোন কৃষক/ দিনমুজুরের ছেলে বিদেশে যায় না।
অতএব এয়ারপোর্টে তাদের কি হলো না হলো তাতে সরকার বা কোন কর্মকর্তার কিছু যায় আসে না। পৃথিবীর যে কোন শিক্ষিত অশিক্ষিত দেশেই যান, সেখানে দেখবেন যারা বিদায় দিতে আসে তাদের জন্য অনেক অনেক ব্যবস্থা করা আছে। টয়লেট তো অবশ্যই , তারপর তারা এক সাথে বসে খাওয়া দাওয়া করবে তারজন্য কয়েক রকমের রেস্তোরা, লাস্ট মোমেন্টে কিছু গিফট কিনে দেয়ার জন্য কোন দোকান। এমনকি হটাৎ কারো ব্যাগ ছিড়ে কাপড় বেরিয়ে পড়লো তারজন্য একটি বেগের দোকান, প্রচন্ড ধকলে অনেকেরই মাথা ধরে বা সাধারণ কোন ওষুধের জন্য একটি দোকান সবই থাকে, কারণ এটাই হচ্ছে উন্নতি এবং সভ্যতার লক্ষণ।
পেপারে আর বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন লাগে না জাতির স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য। কিন্তু , ঢাকা এয়ারপোর্টে আপনার যদি কানেকশন না থাকে তবে আপনি পাড়ার বেওয়ারিশ নেড়ি কুকুরের সমান দাম আপনার। আপনার একমাত্র ছেলের প্রথম বিদেশ যাওয়ার সময়, অথবা এক মাস আগে বিয়ে হওয়া নববধূর স্বামীর বিদেশ যাওয়ার সময় তাদের কোন অনুভূতি থাকতে নেই, থাকতে নেই কোন ভালোবাসা। বিদায় বেলা পারবেন না নিজ সন্তানকে শেষ মুহূর্তে একটু আদর করে বিদায় নিতে। সেই অধিকারটুকু মিডিল ইস্টে একজন ক্লিনারের থাকতে পারে না।
ধমক দিয়ে হুলুস্থূল করে আপনাকে ঢুকিয়ে দিবে, আর বাকিদের বাইরে ঝড় বৃষ্টির মধ্যে উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে হবে ঘন্টার ওপর ঘন্টা একটি খবরের জন্য – “আমি বিমানে উঠছি , তোমরা এবার বাড়ি যাও।” এই কথাটি শুনতে অনেক সময় ৪/৫ ঘন্টা থেকে ৯/১০ ঘন্টাও লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে তারা পারে না বিমান বন্দর ছেড়ে বাইরে যেতে, যদি কোন কারণে তাদের প্রিয়জন ফেরত আসে। এই জন্য যখনই কারো গল্প শুনি ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ জাতি বাঙ্গাল, তখন শ্রেফ তার জন্য ঘৃণা হয়। কারণ, জাতির একটি অংশ কতটা ইতর হলে বছরের পর বছর এই অবজ্ঞা অবহেলা অত্যাচার করে আসছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আয়ের উৎসের কর্মীবাহিনীর উপর?
এয়ারপোর্টের এরাইভালের সামনে আগে যেখানে কারপার্ক ছিল , সেখানে দুবলা ঘাসের সৌন্দর্য না বাড়িয়ে সেখানে দোতালা সমান উঁচু করে দুই তলাতেই, নিচ তলা এরাইভালের জন্য, উপর তলা ডিপার্চারের জন্য টয়লেট, খাবারের দোকান সহ আনুসাঙ্গিক শপিং মল করে দিলে দর্শনার্থীদের অনেক অনেক অনেক উপকার হবে। সেই সাথে ওই জায়গায় কেমন বিজনেস হবে চিন্তা করতে পারেন? বুমিং বিজনেস হবে প্রতিটি দোকানে! আর তিন তলায় একটি চিৎ কাইট হোটেলও করতে পারেন যেখানে গ্রাম থেকে আসা লোকদের ৫/৬ ঘণ্টার জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকবে, বা কেউ চাইলে আগের রাতে এসে থাকতে পারবে।
কিন্তু না, জবাব পাবেন, “গুলি মারেন মিয়া এয়ারপোর্টের ঐ সাৰ ফালতু সৌন্দর্যের। এয়ারপোর্টের সামনে এতো জায়গা কেউ নষ্ট করে না, যদি না আফ্রিকার কোন জঙ্গলি দেশ না হয়। হয়তো তারাও এরকম করে না। লন্ডনের হিথ্রো , নিউ ইয়র্কের জেএফকে বা প্যারিসের চার্লস দি গল এয়ারপোর্টের সামনে কয় ইঞ্চি জায়গা এভাবে নষ্ট করা হয়েছে?” গরিবের ঘোড়া রোগ হলো আমাদের প্রধান সমস্যা।
একজন বৃদ্ধ লোক টয়লেটে যেতে পারছে না , একটি বাচ্চা খাবারের জন্য চিৎকার করছে , কিন্তু সেটা কোন সমস্যাই না, কারণ আমরা খোলা আকাশের নিচেই প্রস্রাব করতে পারি। নিজেরা যদি না পারি তো ভারতের এক্সিম ব্যাংক তো আছেই ওখান থেকে লোন নিয়ে এসে বাঁশ দিয়ে খাড়া করে তার উপর ঢেউ টিনের ঝুপড়ি দোকান করে দিলেও তো সমস্যাটি মিটে যায়। লোন তো ওই ক্লিনার বিদেশ যেয়েই আয় করেই ফেরত দেবে। অসুবিধা কি? কিন্তু না, তা না করে সেখানে দুবলা ঘাস সাজিয়ে দু একটি গোলাপের চারা লাগিয়ে মনে ভালোবাসা জাগানো হচ্ছে , ওরে আমার কবিয়াল জাতিরে!
(যারা গেট দিয়ে ঢুকতে পারে তাদের কাহিনী আসছে পর্ব -২ তে)

