ইউরোপ টপকাচ্ছে ঢাকা, ১০ মিনিটের রাস্তা দেড় ঘন্টা, ১৫ টাকার ভাড়া ৮ ইউরো

এন আই মাহমুদঃ মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়। তবে এক দিনেই প্রধান সড়কসহ অলিগলি ডুবে গেছে। এর পর্যন্ত প্রায় ৪দিনের বৃষ্টিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীবাসী। যত্রতত্র উন্নয়নের সাইনবোর্ড শোভা পেলেও রাস্তাঘাট জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে ন্যূনতম কোনো কার্যকর কর্মসূচি গত ১০ বছরেও দেখা যায় নি। প্রতিবারের জলাবদ্ধতা আগের বারের চেয়ে বেশী হয়ে উঠছে।

ভোগান্তির মুখে রাঝধানী বাসী ১০ মিনিটের পথ কখনো দেড় ঘন্টায় পার হচ্ছেন। ১৫ টাকার বাস ভাড়ার ক্ষেত্রে ৫ গুন সময় ব্যয় করেও ভাড়া গুনতে হচ্ছে রিকশার মত অযান্ত্রিক বাহনে ১৬০ টাকা বা ২ ইউরো, আর যান্ত্রিক পরিবহনে তা ৬০০ টাকা বা ৮ ইউরো পর্যন্ত হচ্ছে। যা হিসেব করলে যে কোনো ভাবে ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে বেশী। কাঠের নৌকা এখন নিত্য প্রয়োজনীয় বাহন হলেও পানি বেজায় দূষিত। ম্যানহোল, স্যুয়ারেজ আর বৃষ্টির পানি সব মিলে একাকার।

অফিস পর্যন্ত যেতে আসতে কিছু পথ নৌকা, কিছু রিকসা, কিছুটা বাসে ও শেষে আবারো রিকশা বা নৌকায় এভাবে ৪/৫ বার ভেঙে ভেঙে পৌঁছুতে হচ্ছে। এতে সময় নষ্ট, সাধ্যের বাইরে ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বেশী অর্থব্যয় করেও নিরাপত্তা বা স্বস্তি কোনোটিই মিলছে না।

গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতের পর থেকে আজ বুধবার সকাল পর্যন্ত বৃষ্টিতে রাজধানীর মিরপুর, কাজীপাড়া, বাংলামোটর, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, বনশ্রী, রামপুরা, সদরঘাট, গুলিস্তান, কাকরাইল, বিজয় সরণি, বিজয়নগর, বংশাল, নয়াবাজারসহ সর্বত্র পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে।

দিন শেষে মানুষ অফিস থেকে ফেরে রাত ১২ টা কিম্বা ১ টা অবধি জ্যামে কিম্বা পানিতে আটকে সময় নষ্ট করে। কিন্তু বাড়ি ফিরেও স্বস্তি নেই, আছে মশা, স্যুয়ারেজ সমস্যা, চিকুনগুনিয়ার ভয়, ওয়াসার বিষাক্ত পানি, বাড়ি-ভাড়ায় অনিয়ম ও অবিচার।

বুধবার সকালে আবহাওয়া কার্যালয় জানিয়েছে, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এ ধারা আজ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কাল একটু কমতে পারে বৃষ্টি।

সকাল থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীতে গণপরিবহনের সংকট দেখা দেয়। অফিসগামী মানুষকে বৃষ্টিতে ভিজে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। এ ছাড়া রাস্তায় পানি ওঠায় জ্যাম ছিল চোখে পড়ার মতো। ১০ মিনিটের রাস্তা পার হতে সময় লেগেছে দেড় ঘণ্টার বেশি।

মিরপুরের বাসিন্দা সায়মন জানান, তিনি মতিঝিলের একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। থাকেন মিরপুর ১১ নম্বরে। বৃষ্টিতে অফিস যেতে প্রচণ্ড সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সকাল ৭টায় রওনা দিয়ে মতিঝিল পৌঁছেন বেলা ১১টায়।

শনির আখড়ার বাসিন্দা মমিন বলেন, প্রবল বৃষ্টিতে শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া প্রায় ডুবে গেছে। পানি ঠিকমতো ড্রেন দিয়ে নামতে পারছে না।

শনির আখড়ার আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ গাফফার হোসেন ইমন বলেন, বৃষ্টিতে অফিসে যেতে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সকাল থেকে পরিবহনের সংকট ছিল। এ ছাড়া বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে ঢাকার নিম্ন আদালত সদরঘাটেও পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। বিভিন্ন মানুষকে রাস্তায় হাঁটুপানি ডিঙিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।

বংশালের বাসিন্দা নায়না বলেন, ‘সকালে বাহির হয়েছি গুরুত্বপূর্ণ কাজে, কিন্তু রাস্তাঘাটে কোমর সমান পানি ওঠায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। রিকশা ভাড়া তিন গুণ দিয়েও গন্তব্যে পৌঁছা যাচ্ছে না। আজ সারা দিন বৃষ্টি হলে ঢাকা শহর ডুবে যাবে মনে হচ্ছে।’

মিরপুরের শেওড়াপাড়া থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন সিরাজুম মুনিরা। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও কোনো গণপরিবহনে উঠতে না পেরে অগত্যা রিকশা নেন। ১৫ টাকার বাস ভাড়া যা রিক্সায় হয় ৮০-১০০ টাকা সেটাই আজ তাঁকে গুনতে হয়েছে ১৬০ টাকা যা প্রায় ২ ইউরো। পথজুড়েই শত শত মানুষকে একটি বাহনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছেন বলে জানালেন। পথে খামারবাড়িসহ বেশ কিছু স্থানে জলজটে পড়েছিলেন। বিশেষ করে বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের পেছনের রাস্তায় রিকশার পাদানি অবধি ছিল পানি।

অন্যদিকে সচিবালয়েও পানি থইথই করছে বলে জানিয়েছেন সেখানে অবস্থানরত গণমাধ্যমকর্মীরা। পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে দুপুরের দিকে যন্ত্রের সাহায্যে সেই পানি সরিয়ে নেওয়া শুরু করে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে বন্যার কারণ দেখিয়ে চালের দামের সঙ্গে সকল নিত্যপন্যের দাম বেড়ে গেলেও তা কমানোর উদ্যোগ ফলপ্রসু হয় নি। ৩০ টাকার চাল ৬০ টাকায় পর্যন্ত বেড়ে গিয়ে কমেছে মাত্র ১ টাকা। সরকারি উদ্যোগে চাল আমদানীর একটি মাত্র চালান এসে পৌছুলেও ঘোষনার পরিমান ও আমদানীতে বিরাট পার্থক্যের কারণে এতে কোনো লাভ হয় নি।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য মাংস সহ অনেক খাদ্য আরো কয়েক বছর আগে থেকেই ইউরোপের দেশ গুলোর চেয়ে বেশী দামে কিনে খেতে হয় বাংলাদেশের মানুষের। ইউরোপের দেশগুলোর বেশীর ভাগ শহরে হাড়সহ গরুর মাংস ৪ ইউরো বা প্রায় ৩২০ টাকা এবং হাড় ছাড়া ৬ ইউরো বা ৪৮০ টাকায় বিক্রি হয়। বাংলাদেশে এখন হাড়সহ গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ন্যুনতম ৫০০ টাকা বা প্রায় ৭ ইউরো হারে, তবে তা শহরের অভিজাত এলাকায় আরো কয়েকশ পর্যন্ত বেড়ে থাকে। এরই মধ্যে চাইনিজ রেস্তোঁরা সহ অনেক বিরিয়ানী প্রতিষ্ঠানে কুকুরের মাংস ও মরা মুরগীর সয়লাব হয়ে আছে। ইউরোপের চেয়ে বেশী দামে কিনতে হচ্ছে শ্যাম্পু দিয়ে তৈরী দুধ, টিস্যু দিয়ে তৈরী মিষ্টি, ছানা, দই, আর পা দিয়ে পাড়ানো রুটি কিম্বা সেমাই।

পানি সম্পদমন্ত্রীর দেয়া আশঙ্কা অনুযায়ী আরো বন্যা হতে থাকলে সে অনুসারে পদক্ষেপ যে যথেষ্ট হতে যাচ্ছে না তা উত্তরাঞ্চলের বন্যা সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উদাসীনতা ও ব্যর্থতাই বলে দিচ্ছে।

মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের তুলনায় কয়েকগুন কেন কোটি টাকা ব্যয় করে বসবাসের চেষ্টা করলেও এ শহরের বিখ্যাত র‍্যাডিসন হোটেলের সামনের গলা পানি ও তার সামনে ডিএমপি’র লাগানো “পানির নিচে রাস্তা ভাল আছে” লেখা সম্বলিত সাইন বোর্ড দিয়ে সিটি কর্পোরেশন কিম্বা মন্ত্রী আমলাদের ব্যর্থতার লজ্জা ঢেকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.