আমাদের দুবাইওয়ালা: নেপথ্যের নায়কদের কথা

Dubai_wala_bg_368614170

সত্তর ও আশির দশকে দেশে রাজনীতির নানা দোলাচল। তখনই দূর মরুর বুকে নিজেদের ভাগ্য গড়তে প্রাণান্ত লড়ে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। হয়ত নিজেদের অজান্তেই গড়ছেন নতুন ইতিহাস। এক অন্য বাংলাদেশ। সে লড়াইয়ের মূলধন ছিল ঘাম, রক্ত, শ্রম আর মেধা। তিলে তিলে বাঁধার পর্বত ঠেলে কল্পনাকে হার মানিয়ে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছেছেন তাঁরা। ভাগ্য বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বদলে দিয়েছে সামাজিক অবস্থান আর গ্রহণযোগ্যতা।

তখন প্রবাসী আর দুবাইওয়ালা সমার্থক শব্দ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উন্নাসিক উচ্চারণ ছিল ‘ও দুবাইঅলা’। যারা হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের দেশে পৌঁছাতেন তাদের অনেকেও জানতেন না দুবাই ঠিক কোথায়? তাদের কাছে বিদেশ মানেই তো দুবাই। লক্ষ্য জানা ছিল, পথ জানা ছিল না। জানা ছিল না সেই মরুর দেশের ভাষা। কেমন সেখানকার রীতিনীতি। কেমন খাবার দাবার। কাজের ধরনই বা কি। শুধু জানা ছিল ‘যেতে হবে’। তাই তো কেউ ভ্রমণ ভিসায় কেউ অল্প বেতনের চাকরির ভিসা নিয়ে পাড়ি জমালেন দুবাইয়ে। তার পরের গল্পগুলো সংগ্রামের। শুধু সংগ্রামের নয় বিবর্তনেরও। বিদেশ বিভুঁইয়ে কখনো পেশা পাল্টেছেন কখনো ঠিকানা। কেউ মাঝপথে ফিরেছেন। আবার গেছেন। দমে যাননি কিছুতেই। দমবার পাত্র তারা নন। জেগে উঠেছেন ধ্বংসস্তুপ থেকে।

নায়কের মতো পাল্টে দিয়েছেন জীবন কাহিনির গতিপথ।বিক্ষুব্ধ সাগরে লড়ে যাওয়ার ঐতিহ্য তাদের রক্তে। শত বছর আগেও তাদের পূর্বপুরুষ পাড়ি দিয়েছেন রেঙ্গুন। ব্যবসা করেছেন, প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। সময়ের পরিক্রমায় গন্তব্য বদলেছে। কিন্তু পূর্বপুরুষের নজির অনুসরণ করে গেছে উত্তর পুরুষ। শুধু ঠিকানা বদলেছে। কয়েক শতাব্দী আগের রেঙ্গুনের স্থান নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। স্বপ্নের দুবাই পৌঁছেই তাদের বিবর্তন থেমে থাকে নি। ওই দেশের বদলাতে থাকা ব্যবসা, সংস্কৃতি আর জীবনমানের সাথে এক প্রজন্মই খাপ খাইয়ে নিয়েছেন দারুণভাবে। রেঙ্গুন যাওয়া, সেখানে সাফল্যের সাথে ব্যবসা করা। প্রতিষ্ঠা পাওয়া আর সংসার করে নতুন জীবন শুরুর সবটা ইতিহাস এখন আর খুঁজলেই পাওয়া যাবে না। সেটা সহজলভ্যও নয়। তবে এবারের সংগ্রামের ইতিহাস দুই মলাটে আবদ্ধ হতে শুরু করেছে। এক সংগ্রামী প্রবাসীর সন্তানের হাত ধরেই সে ইতিহাসের প্রথম পদক্ষেপ ‘আমাদের দুবাইওয়ালা’।

সেটাই তো যথার্থ। এখানেই লেখা হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের নিরন্তর যাত্রার কথা। এগিয়ে যাওয়া, পিছিয়ে পড়া, পদে পদে বাধা আর সাফল্যের সব অজানা কথা। ’৭৫-’৭৬ সালে প্রথম সাগর তীরের নগরী চট্টগ্রাম থেকে পারস্য উপসাগর পাড়ের দুবাই পৌঁছালেন চট্টগ্রামের মানুষ। কেমন ছিল সেসময়ে দুবাই? কেমন ছিল তাদের অর্থনীতি? প্রবাসীদের কাজের ক্ষেত্রই বা কেমন ছিল? আর একবিংশ শতাব্দীর এই প্রথম দশকে কোথায় দাঁড়িয়ে দুবাই। কেথায় আমাদের নেপথ্যের নায়কেরা। পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দ্বিতীয় বৃহত্তম আমিরাত (আমির শাসিত এলাকা) দুবাই। ১৯৩০ এর মহামন্দায় দুবাইয়ের মুক্তা রপ্তানি শিল্পে ধস নামলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এ বন্দর নগরীর অর্থনীতি। ১৯৬৬ সালে দুবাইয়ে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। এরপর ১৯৬৯ সাল থেকে তেলনির্ভর অর্থনীতির শুরু। তবে তেল নির্ভরতার সে যুগ পেরিয়ে দুবাই এখন বিজনেস হাবে পরিণত হয়েছে। দুবাইয়ের প্রধান রাজস্ব আয় খাত এখন পর্যটন, রিয়েল এস্টেট ও অর্থনৈতিক সেবা নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল ও বিশ্বে ২২তম ব্যয়বহুল শহর এখন দুবাই। বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফাও এ শহরে। শুরুতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। অল্প বেতনে। দুই দশকের শ্রমে অল্প কিছু পুঁজি যাদের হাতে জমেছে তারাই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

দুবাইয়ের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝে বিনিয়োগ করেছেন আবাসন, শ্রম শক্তি, অটোমোবাইল, অ্যাড ফার্মসহ নানা শিল্পে। পথ চিনতে ভুল করেননি প্রবাসীরা। লক্ষীও এসেছে বাণিজ্যের হাত ধরেই।সেই সফল মানুষের জীবন কেমন ছিল। কালের কণ্ঠের স্টাফ রিপোর্টার এস এম রানা রচিত ‘আমাদের দুবাইওয়ালার‘র পাতায় পাতায় তার বয়ান। হাটহাজারীর মেখল গ্রামের কৃষক পিতা আবদুর রহমানের ছেলে এম এন আলম একক প্রচেষ্টায় এখন দুবাইয়ে আলম গ্রুপ অব কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। এটা শুধু তার সাফল্যের গল্পই নয় এক প্রজন্মের ব্যবধানে পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল শহরে এক বাংলাদেশির শিল্প গ্রুপ প্রতিষ্ঠার আখ্যানও। দোকান কর্মচারী থেকে বাংলাদেশ-মধ্যপ্রাচ্য হয়ে কানাডায় ব্যবসার এ স্বপ্নযাত্রা যেন চলচ্চিত্রকেও হার মানায়। চন্দনাইশের মোহাম্মদ আকতার হোসেন আধুনিক দুবাইয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নিজের মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আকতার হোসেনের বাবা রমিজ আহমেদ ছিলেন শ্রমিক সরবরাহকারী। রমিজ আহমেদের দাদা ছিলেন জমিদার। জমিদারি হারিয়ে নিঃস্ব একটি পরিবারের পুনরুত্থানের গল্প রচনা করেছেন আকতার হোসেন। রাঙ্গুনিয়ার পোমরার মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন মদিনা। আড়াই হাজার শ্রমিককে গত তিন দশকে প্রবাসে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন মদিনা। সব গল্পই স্বপ্নপূরণের নয়। আবার স্বপ্ন ভগ্নেরও নয়। বাধা যেন আরও অজেয় করে তুলেছিল আমাদের নায়কদের। রাউজানের দক্ষিণ হিঙ্গলা গ্রামের মোহাম্মদ আবুল হাশেম।

স্নাতক পাস করে জাহাজে চাকরি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন আরব আমিরাতে। চাকরিদাতার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতারণা আর সাড়ে তিন লাখ দিরহাম গচ্ছাও দমাতে পারেনি আবুল হাশেমকে। অদম্য প্রাণশক্তির সাফল্য অঙ্কের হিসেবে এখন শতকোটি টাকা ছুঁয়েছে। সাজ্জাতুল ইসলাম সেলিম সেলসম্যান থেকে আল আতলাল গ্রুপ অব কোম্পানির পরিচালক। পথটা সহজ ছিল না। তবে প্রবাসে বাড়িয়ে দেয়া বন্ধুর হাতও ছিল। সহযোদ্ধার হাত আজম খানের সাফল্যের পেছনেও। ১৪টি মোটরপার্টস প্রতিষ্ঠানের মালিকানা আজ সাফল্যের খতিয়ান। নূর মোহাম্মদ ও ফজলুল কবির চৌধুরীর মালিকানাধীন অ্যাড ফার্মে কর্মরত সবাই বাংলাদেশি।উচ্চ শিক্ষিত ফজলুল কবির চৌধুরী ইমাম। টাইপিস্ট, মুদি দোকান চালানো আর সর্বশেষ টিউশনিও করেছেন। রাউজানের নোয়াপাড়ার সারাফাত আলী সেনিটারি অ্যান্ড পেন্টিং এবং অটো রিপেয়ারিং ওয়ার্কশপ চালু করেছেন। দুবাই কার্গো ভিলেজে তিনশ’ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানটি চকরিয়ার আসফাক উর রহমানের। পোশাক কারখানার বিক্রয় কর্মী থেকে, পাঁচতারা হোটেল আর জনসংযোগ কর্মকর্তা নানা পথে হেঁটেছেন সংগ্রামী আসফাক। আবার বঞ্চনার কথাও আছে। মুনিরুল হাসান চৌধুরীর জবানিতে সেটাই ওঠে আসে। নিজের চেষ্টায় মোটর পার্টস ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের প্রতিষ্ঠা করা এ উদ্যোক্তার কথায় জানা যায় দূতাবাসের অসহযোগিতার বয়ান। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিয়ে নানা নেতিবাচক আখ্যান আমরা দেশে বসে শুনতে পাই। কিন্তু এর বিপরীতে সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীরাও যে আছেন তা জানা যাবে মাহমুদুল হককে নিয়ে লেখা ‘সততাকে পুঁজি করে এত দূর এসেছি’ অংশটি পাঠ করে। উটের জকি মাহবুবুল হক বাবলু অর্ধভুক্ত থেকে অনেক রাত কাটিয়েছেন। ভিসা জটিলতায় দেশেও ফিরতে হয়েছে তাকে। তবু থেমে যাননি, দমে যাননি। সফলতার হাসি হেসেছেন তাই লড়াই শেষে। মরুর বুকে বাংলার সবজি ফলিয়েছেন রাউজানের মোহাম্মদ সেলিম।SM-Rana

হাটহাজারীর মিজানুর রহমান ঊষর মরুতে ফুটিয়েছেন ফুল।পিছিয়ে নেয় বাংলাদেশি নারীরাও। শারজাহ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির আড়াইশ’ প্রশিক্ষকের মধ্যে ২৫ নারী। আর এদের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশি চট্টগ্রামের কাপাসগোলার তাসলিমা জান্নাত পুতুল। শুধু তাই নয় পুতুল এদের মধ্যে সেরা।ব্যবসা ও সামজিক কাজে অবদানের জন্য আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় পদক পেয়েছেন আকতার হোসেন। পরবর্তী প্রজন্মও এগিয়ে যাচ্ছে সদর্পে। ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আইমান উদ্দিন (ইবু) ঘুরে এসেছেন নাসা থেকে। এখনো যারা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রাণান্ত করছেন তাদের কথাও আছে ‘বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই’ ও ‘পাতে সামান্য ডাল-ভাত, ক্ষুধার্ত ছয় জন’র আখ্যানে।শুধু সাফল্য বা ইতিবাচকতা নয়। উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র। প্রবাসে বাংলা শিক্ষার সুযোগের অভাব, ভিসা জটিলতা, হুন্ডি ব্যবসা আর অন্ধকার জগতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জড়িয়ে পড়ার তথ্য ধরা পড়েছে অনুসন্ধানী চোখে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠা লাভ চট্টগ্রামের সমাজ ব্যবস্থায় কি প্রভাব ফেলল। তাও অনুধাবন করা যায়- নারী-পুরুষের পোশাকে পরিবর্তন, ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দ যুক্ত হওয়া, বিশেষ ধরনের গহনার শখ। আর ভ্রমণ অভ্যাস নিয়ে লেখার।গ্রন্থ রচয়িতা এস এম রানা পেশায় সাংবাদিক। সংবাদপত্রের একজন প্রতিবেদকের শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রবাসীদের জীবনালেখ্য রচনার এ প্রয়াস তাদের সঙ্গে লেখকের আন্তরিক সম্পর্কই প্রকাশ করে। এ শুধু শ্রমজীবী মানুষের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার গল্প নয়। এক অন্য বাংলাদেশের গড়ে ওঠার আর চট্টগ্রামবাসীর প্রবাস জীবনের সত্যি ইতিহাস চর্চার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আমাদের দুবাইওয়ালা লেখক : এস এম রানা
প্রকাশক : জসিম উদ্দিন,
কথাপ্রকাশপ্রচ্ছদ : মাহবুবুল হক
মূল্য : ৫০০ টাকা
লেখক: বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-এর স্টাফ রিপোর্টার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *