*কানিজ ফাতিমা, হেড অব প্রোগ্রাম, ভয়েস ফর বাংলাদেশ ইউকে
সহজ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করলে বলতে হবে রাজনীতি নিজে কোন কর্মসূচি না বরং কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল হল রাজনীতি। রাজনীতির সাথে ক্ষমতায় থাকা না থাকাটা অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আপনি যদি দেশব্যাপী বৃহত্তর কোন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চান তাহলে আপনার ক্ষমতা থাকাটা জরুরি। ক্ষমতা মানেই যে খারাপ কিছু বিষয়টা কিন্তু এমন না। এখন দেখি রাজনীতি যদি কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল হয় তাহলে তার কর্মসূচি কি কি হবে সেটা পরিষ্কার থাকতে হবে। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রম একটি দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। দেশব্যাপী সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন তার অর্থনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে। আওয়ামীলীগের নেতারা প্রায়শই বলে থাকেন দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে। বাস্তবে কি হচ্ছে? অর্থমন্ত্রী কিছুদিন আগে নিজেই স্বীকার করেছেন ব্যাংকিং সেক্টরে পুকুর নয় সাগর চুরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্তে গঠিত ডঃ ফরাসউদ্দিনের কমিটির তদন্ত রিপোর্ট পেশ করার ডেডলাইন ছিল ২২ সেপ্টেম্বর। কিন্তু “রাবিশ” “ষ্টুপিড” বলে খ্যাতি অর্জনকারী অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি ২১ সেপ্টেম্বর নিজেই বলেছেন শিগগিরই এ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে না। দেরি হবে। বেশ দেরি হবে। অর্থাৎ সম্ভবত আর কোন দিনই আওয়ামীলীগের বিশ্বস্ত ব্যাক্তি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ডঃ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিটির তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে না। এর আগে সরকারের ঘনিষ্ঠমহল শেয়ার বাজারে কারসাজি করে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়েছিল। সর্বস্ব হারিয়ে অনেক নিঃস্ব বিনিয়োগকারী আত্মহত্যাও করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদকে প্রধান করে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করার আগে রাবিশ অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এতে অনেক প্রভাবশালী ব্যাক্তির নাম জড়িত আছে, প্রকাশ করা যাবে না। সরকার সেই রিপোর্ট শেষ পর্যন্ত প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছিল। এর পর খালেদ ইব্রাহিম মামলার পর মামলা খেয়েছেন। সরকার তার পক্ষে দাড়ায়নি। এগুলি হচ্ছে আওয়ামীলীগের অর্থনৈতিক কর্মসূচি।
শুধু ব্যাংকিং সেক্টর নয় আপনি যদি বিদ্যুৎ সেক্টর দেখেন তাহলে কি দেখবেন সেখানে? দেশে বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে বিগত বিএনপি সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেন কাজ করেনি সেই ধোওয়া তুলে আওয়ামীলীগ সরকার ২০০৮ সালে কুইক রেন্টাল চালু করলো কোনরকম টেন্ডার ছাড়াই তা আজও চলছে। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে এক দুই বছর কুইক রেন্টাল করা যেতে পারে। ইনডেমনিটি তৈরি করে শুরু করা কুইক রেন্টালটা যখন প্রবণতাতে পরিণত হয়েছে তখন বলার অপেক্ষা রাখে না সেখান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। রাজধানী শহরে বা গ্রামাঞ্চলে যে রাস্তা, ফ্লাইওভার বা সেতুর প্রকল্প এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে শুরু হয়ে সেটা শেষ হয় ১২/১৩ হাজার কোটি টাকাতে। আর নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করতে না পারার বিষয়টা যেন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে গেছে। এই প্রকল্পগুলি অধিকাংশই হচ্ছে টেন্ডার ছাড়া অথবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গুটিকয়েক বেনিয়া গোষ্ঠীর স্বার্থকে লক্ষ্য করে। এই গোষ্ঠীর সংখ্যা হবে সর্বসাকুল্যে ০.০৫ শতাংশ। উন্নয়নের জোয়ার এই গুটি কয়েক বেনিয়াদের হচ্ছে বটে। এই জোয়ারটাই সাগরমুখে পতিত হয়ে চুরি হয়ে গেছে। এটা হল আওয়ামীলীগের অর্থনৈতিক কর্মসূচির নমুনা। এখন আসা যাক আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক কর্মসূচি কি সেটা দেখা যাক। সংখালঘু নির্যাতন দিয়ে শুরু করা যাক। এখন প্রতিদিন (আমি প্রায় শব্দটি যোগ করলাম না) প্রত্যেকটি খবরের কাগজে সংখালঘু নির্যাতনের খবর আসে। সংখালঘুদের নির্যাতনের যে খবর আসে তার ৯০% ক্ষেত্রে আওয়ামীলীগের যুবলীগ, ছাত্রলীগের গুন্ডারা জড়িত। হিন্দু-বোদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ থেকে জাতীয় পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন করে লিস্ট দিয়ে বলেছে আওয়ামীলীগের কারা কারা কোথায় সংখালঘু নির্যাতন করেছে। একদিকে মুখে এরা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির কথা বলবে অন্যদিকে সংখালঘু নির্যাতন করে তাদের সম্পত্তি দখল করবে। এগুলি হল আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে রাজনীতিটা আসলে তাহলে কি? শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকা বা অন্যের সম্পত্তি হরণ করার নাম রাজনীতি?
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ অনেকগুলি কর্মসূচি নিয়ে এসেছিল এবং সে কারনেই তারা পাশ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই কর্মসূচির কি হয়েছিল তা একটি ছোট উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ২০১১ সালের মধ্যে সারা দেশে সুপেয় পানির ব্যাবস্থা করবে। ২০১৬ সাল এখন এটা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
এগুলি হচ্ছে আওয়ামীলীগের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। আওয়ামীলীগ যদি কোনভাবে তাদের স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা “মিশন ২০২১” বা দীর্ঘমেয়াদী “মিশিন ২০৪১” পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে তাহলে চিন্তা করুন ১৯৭১ সাল পরবর্তী বাংলাদেশ যেখানে ছিল “তলাবিহিন ঝুড়ি” সেখানে বাংলাদেশেকে তলাবিহিন তো দূরের কথা ঝুড়ির কোন নাম নিশানা এরা রাখবে না।
গনতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এখন পরিচালিত হচ্ছে পারসোনাল সিস্টেম অব গভারনেন্সে যেখানে গনতন্ত্রের লেশমাত্র নেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে এখন খুব একটি সংকীর্ণ জায়গায় চলে গেছে। বাংলাদেশে এখন স্বৈরতান্ত্রিক ব্যাবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। যেমন সংবিধান তিনটি বড় শক্তি একজনকে দিয়ে রেখেছে। যিনি সরকার প্রধান, তিনি আবার জাতীয় সংসদেরও প্রধান। তিনিই আবার ক্ষমতাসীন দলেরও প্রধান। সংবিধান এই তিনটি ক্ষমতা এক ব্যাক্তিকে দিয়ে রেখেছে অত্যন্ত বৈধভাবে। সম্প্রতি জাতিসংঘে বক্তৃতা করার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পীকার সকলেই নারী। যে কথাটা উনি বলার সৎ সাহস রাখেননি সেটা হল তাদের কেউই জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়।
লক্ষ্য করার বিষয় হল সংবিধানে যদি এরকম একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে অন্য কোন রাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হওয়া ত দূরে থাক, একব্যাক্তিকেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক ব্যাবস্থা থাকে সেখানে নিজ দলের ভিতরেও গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই একব্যাক্তিকেন্দ্রিক পরিস্থি থেকে উত্তরণের জন্য চেষ্টা করা রাষ্ট্রের গনতন্ত্রের রূপান্তর প্রত্যাশী প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। রাজনীতির এই চেহারা পরিবর্তনের জন্য আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব পুরাতন রাজনীতির দিকে ফিরে যেতে হবে। আপনারা জানেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে, আলোচনার টেবিলে বসে হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেকগুলি প্রতিশ্রুতি ছিল। ১৯৭১ সালে যে অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়েছিল তার মধ্যে একটি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা হলে সেখানে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা হবে। সাম্যটা কি জিনিস? সাম্য হল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সাম্য। সাম্য মানেই মুসলিম ও হিন্দুর মধ্যে সাম্য। সাম্য নামেই বাঙ্গালি ও অবাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্য। সাম্য মানেই অর্থনৈতিক ভাবে সকলের জন্য সমান অধিকারের সাম্য। স্বাধীনতার আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিকের ব্যাতিগত মর্যাদা সমুন্নত রাখার সাম্য। এগুলোর কোনটাই এই স্বৈরতান্ত্রিক সরকার পূরণ করতে পারেনি।
বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশ ও সমান তালে এগিয়ে চলেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়া এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। এখান থেকে আমাদের অর্জন কি হবে তা পুরোটাই নির্ভর করছে প্রথমে রাষ্ট্র হিসাবে এবং রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় আমরা আমাদেরকে শক্তিমান রেখে আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাখতে পারি কি না। লক্ষ্য করার বিষয় হল আমাদের ব্যাক্তিগত জীবনে ৫ বছর বা ১০ বছর বিরাট বিষয় হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের মত একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রের জীবনে এই ১০ বা ২০ বছর মোটেও দীর্ঘ সময় নয়। আমরা যদি রাষ্ট্রের যে অঙ্গীকার সেই অঙ্গীকারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে পারি তবেই গনতন্ত্রের উত্তরণ সম্ভব। একটি জাতির জীবনে বিভিন্ন ধরণের দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। আমাদেরকে সেই সব বাধা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
জাতি গঠন প্রক্রিয়াতে প্রতিষ্ঠান তৈরির কোথাও কোন উদ্যোগ নেই। বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের সঙ্কটের জায়গাটা হল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের দিকে উঁকি দিচ্ছে সেটার সাথে নিজেকে মানিয়ে নেবার যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ পুরোটাই অনুপস্থিত। এই বিষয়গুলো আমাদের রাষ্ট্রের দুর্বলতাকে মূর্তমান করে তুলছে। কারন আস্থার জায়গাতে ইতিমধ্যে চিড়ি ধরেছে। এই পরিস্থিতিকে উত্তরণ যদি করতে না পারি তাহলে আমাদের যে ক্ষতিটা হবে সেটা হল আমাদের রাজনৈতিক উন্নয়ন প্রায়শুন্য হবে। তথাকথিত গনতন্ত্রের মানসকন্যা নিজের দলে ও দেশে প্রকৃত গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হবেন, জনগণের মৌলিক ভোটাধিকার নিশ্চিত করবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা।
