ট্রানজিট চুক্তি হতে পারে আত্মঘাতী

sar

পৃথিবীর প্রায় বেশির ভাগ দেশ গুলি পাশের দেশের সীমা রেখার সাথে লাগোয়া । তার ভেতর অনেক দেশ আছে যার কোনো সমুদ্র সীমা নেই। ইংরেজীতে তাদের বলে Landlocked country যেমন নেপাল । ফলে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের সুযোগ নেই তাদের এক্ষেত্রে তাদের পার্শ্ববর্তী দেশ যার সমুদ্র সীমা আছে তাদের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিই এই ধরনের কাজের মূল উদ্দেশ্য। ট্রানজিট তাদের মধ্যে একটি সহযোগিতার মাধ্যম। তবে সমুদ্রসীমাই খালি ট্রানজিটকে নিয়ন্ত্রণ করে তা না। আরো অনেক বিষয়ের উপর এটি নির্ভর করে। কিন্তু কোনো দেশই সে সহযোগিতা গ্রহণকারী হোক আর প্রদানকারীই হোক নিজের দেশের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই আপোশ করবে না। ইদানীং ট্রানজিট নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে ভারতের একটি প্রতিনিধি দলকে স্থলসীমা খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রতি দিয়েছেন |

এখন ধরে নেওয়া যায় ভারত যে ট্রানজিট সুবিধা পাবে তা মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু ট্রানজিটে ভারতের কী সুবিধা দেয়া হবে, বিনিময়ে আমরা কী পাবে, এতে কার সুযোগ সুবিধা কতটুকু এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকার নিঃশ্চুপ । এই মুহূর্তে কলকাতা-আগরতলার দূরত্ব ১৬৮০ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে মিজোরামের আইজলের দূরত্ব ১৫৫০ কিলোমিটার। আবার কলকাতা থেকে মেঘালয়ের শিলং ১১৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং কলকাতা থেকে নাগাল্যান্ডের কোহিমার দূরত্ব ১৪২০ কিলোমিটার। ভারত করিডর পেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সব অঞ্চলের ভৌগোলিক দূরত্ব এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কমে যাবে |

আবার ভারত চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার শুরু করলে তখন চট্টগ্রাম-আগরতলার দূরত্ব হবে ২৪৮ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-আইজল ৬৫৫ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-শিলং ৫৭৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম-কোহিমার দূরত্ব দাঁড়াবে ৪৪০ কিলোমিটারে।
করিডর প্রয়োজন ভারতের, বাংলাদেশের নয়। অথচ চড়া হারে সুদ দিয়ে ভারত থেকেই ৮৫ শতাংশ পণ্য কিনতে হবে বাংলাদেশকে। আর ভারত থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হবে শতভাগ ভাগ। এই খাতে বাংলাদেশীদের কোনো প্রবেশাধিকার রাখেননি। রাষ্ট্র তার ভূমি অন্য একটি রাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেবে আর রাষ্ট্রের নাগরিকরা সে বিষয়টি নিয়ে কিঞ্চিত জানে এমন হলে তো বলতে হয় গণতন্ত্রের নামে এটা স্বৈরতন্ত্র ছাড়া কিছুনা | নাগরিকদেরকে অন্ধকারে রেখে ভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করলে তা গণতন্ত্র হয় না।

পত্রিকায় শুধু ট্রানজিটের কথাই শুনি। কিন্তু এতে কী কী সুবিধা দেয়া হচ্ছে তার কোনো উল্লেখ কোথাও পাচ্ছি না। জনগণকে এ বিষয়টি পরিস্কার করে বুঝা উচিত | ধরা যাক চুক্তিতে লেখা হয়েছে ‘ট্রানজিট দেয়া হবে’। তাহলে ভারতে চাইলেই অস্ত্রশস্ত্র থেকে শুরু করে যা খুশি তাই পরিবহন করতে পারবে। আর আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এত ভাল না যে এই অস্ত্রের অপব্যবহার সহজে রোধ করতে পারব। তাছাড়া বাংলাদেশের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা কথিত জঙ্গী গুষ্টিদের যদি এই অস্ত্রের ভাগ দেওয়া হয় তবে দেশ আভগানিস্থান বা পাকিস্তানের মত দেশের পরিনতি বরণ করা লাগতে পারে এটা ভাবা স্বাভাবিক | অন্যদিকে ট্রানজিটের জন্য দেশের ভিতরের নতুন রাস্তা নির্মান পুরাতন গুলো গঠন করার জন্য বাংলাদেশ কেই অর্থ খরচ করতে হবে |

চুক্তি হলে ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করবে। তাহলে বন্দরের উপর চাপ আরো বাড়বে। এখন ধরলাম মংলা বন্দরে তাদের জাহাজ আসল। এখন বাকি রাস্তায় এই জাহাজের পণ্য কে পরিবহন করবে? বাংলাদেশ নাকি ভারত। যেই করুক তাকে ফেরী ব্যবহার করতেই হবে। কারণ খুলনা বরিশাল অঞ্চল থেকে দেশের অন্য অঞ্চলে যেতে হলে ফেরী ছাড়া গতি নেই। তার মানে দাড়াল ফেরীর উপরও চাপ বাড়বে। দেশে কী এত ফেরী আছে যে এই বাড়তি পরিবহনকে সামাল দেবে? সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল ভারতের কী আদৌ ট্রানজিটের প্রয়োজন আছে?

এই সুবিধা না পেলে তাদের ক্ষতি কী খুবই বেশী নাকি সুবিধা দিলে আমাদের ক্ষতি বেশী? বাংলাদেশের সাথে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের। বাংলাদেশ ভারতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের মত রপ্তানী করে। আর ভারত থেকে আমদানী করে ৫০০ কোটি ডলারের চেয়েও অনেক বেশী। তারা আমাদের পণ্য ঢুকতে দেয়না কিন্তু আমাদের জমি ব্যবহার করতে চায়। এটা কোন যুক্তিতে পরে ? বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনেক সমস্যা রয়েছে সেগুলো প্রথমে গুরত্বের সাথে মোকাবেলা করা দরকার , তার পর দি-পাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন মূলক বিষয় কে সামনে আনাই যুক্তিক হবে |

 

সাংবাদিক- ছরোয়ার হোসেন
প্যারিস , ফ্রান্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.